০৭:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে নির্মিত ‘বীর নিবাস’ বিক্রির অভিযোগ, তদন্তে দাবি

Ada. Munna Telecom1

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বাড়াদি গ্রামে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা লস্কর আলীর নামে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত ‘বীর নিবাস’ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তার ছেলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ইসমাঈল হোসেন সেরেগুলের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বীর নিবাস নির্মাণের শুরু থেকেই প্রকল্পের শর্ত লঙ্ঘন, অনিয়ম এবং প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের ‘বীর নিবাস’ প্রকল্পের আওতায় কয়েক বছর আগে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা লস্কর আলীর নামে একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তার ছেলে ইসমাঈল হোসেন সেরেগুল ওই প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, বীর নিবাস প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী অসচ্ছল, ভূমিহীন, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার কিংবা প্রান্তিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। কিন্তু লস্কর আলীর পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিল না। পরিবারের সদস্যদের একাধিক বাড়িঘর রয়েছে এবং তার ছেলে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কর্মরত আছেন। ফলে প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তারা আরও অভিযোগ করেন, প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী উপকারভোগীর নামে ন্যূনতম দেড় শতাংশ বসতভিটার জমি থাকা কিংবা খাসজমি বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বীর নিবাসটি উপকারভোগীর নিজস্ব জমিতে নির্মাণ করা হয়নি। বরং বাড়াদি গ্রামের সায়েরা খাতুনের জমিতে ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ঘর নির্মাণের পর সেটি সায়েরা খাতুনের কাছে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রির মৌখিক চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিনি ইতোমধ্যে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি অর্থায়নে নির্মিত বীর নিবাসটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সেখানে কোনো বসবাসের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সায়েরা খাতুন প্রথমে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে তিনি জানান, ঘর নির্মাণের সময় প্রয়োজন হলে জমি বিনিময়ের কথা বলতে বলা হয়েছিল। তবে বাস্তবে কোনো জমি বিনিময় হয়নি। পরবর্তীতে ঘরটির জন্য পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং তিনি এখন পর্যন্ত এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি অর্থে নির্মিত বীর নিবাস কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা ভাড়া দেওয়া যাবে না। উপকারভোগী মুক্তিযোদ্ধা বা তার বৈধ উত্তরাধিকারীরা শুধুমাত্র বসবাসের উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করতে পারবেন। কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী না থাকলে অথবা বাড়িটি পরিত্যক্ত হলে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ সরকারের কাছে ফিরে যাওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ইসমাঈল হোসেন সেরেগুল। তিনি বলেন, “আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের শালিকার জমিতে ঘরটি নির্মাণ করেছি। তিনি আমাকে ভাই বলে ডাকেন। সেই কারণে তার জমিতে ঘর করা হয়েছে। বাড়িটি বিক্রি করা হয়নি এবং তার কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। কেউ টাকা দেওয়ার দাবি করলে তাকে আমার কাছে আসতে বলুন।” একপর্যায়ে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, “আপনাকে এসব কে বলেছে?”

এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি সম্পদ পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সুত্র – দৈনিক মাথাভাঙ্গা

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে নির্মিত ‘বীর নিবাস’ বিক্রির অভিযোগ, তদন্তে দাবি

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে নির্মিত ‘বীর নিবাস’ বিক্রির অভিযোগ, তদন্তে দাবি

প্রকাশের সময় : ০৬:৫৭:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বাড়াদি গ্রামে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা লস্কর আলীর নামে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত ‘বীর নিবাস’ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে তার ছেলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ইসমাঈল হোসেন সেরেগুলের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বীর নিবাস নির্মাণের শুরু থেকেই প্রকল্পের শর্ত লঙ্ঘন, অনিয়ম এবং প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের ‘বীর নিবাস’ প্রকল্পের আওতায় কয়েক বছর আগে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা লস্কর আলীর নামে একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তার ছেলে ইসমাঈল হোসেন সেরেগুল ওই প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, বীর নিবাস প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী অসচ্ছল, ভূমিহীন, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার কিংবা প্রান্তিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। কিন্তু লস্কর আলীর পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিল না। পরিবারের সদস্যদের একাধিক বাড়িঘর রয়েছে এবং তার ছেলে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কর্মরত আছেন। ফলে প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তারা আরও অভিযোগ করেন, প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী উপকারভোগীর নামে ন্যূনতম দেড় শতাংশ বসতভিটার জমি থাকা কিংবা খাসজমি বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বীর নিবাসটি উপকারভোগীর নিজস্ব জমিতে নির্মাণ করা হয়নি। বরং বাড়াদি গ্রামের সায়েরা খাতুনের জমিতে ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ঘর নির্মাণের পর সেটি সায়েরা খাতুনের কাছে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রির মৌখিক চুক্তি করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিনি ইতোমধ্যে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি অর্থায়নে নির্মিত বীর নিবাসটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সেখানে কোনো বসবাসের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সায়েরা খাতুন প্রথমে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে তিনি জানান, ঘর নির্মাণের সময় প্রয়োজন হলে জমি বিনিময়ের কথা বলতে বলা হয়েছিল। তবে বাস্তবে কোনো জমি বিনিময় হয়নি। পরবর্তীতে ঘরটির জন্য পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং তিনি এখন পর্যন্ত এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি অর্থে নির্মিত বীর নিবাস কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা ভাড়া দেওয়া যাবে না। উপকারভোগী মুক্তিযোদ্ধা বা তার বৈধ উত্তরাধিকারীরা শুধুমাত্র বসবাসের উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করতে পারবেন। কোনো বৈধ উত্তরাধিকারী না থাকলে অথবা বাড়িটি পরিত্যক্ত হলে সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ সরকারের কাছে ফিরে যাওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ইসমাঈল হোসেন সেরেগুল। তিনি বলেন, “আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের শালিকার জমিতে ঘরটি নির্মাণ করেছি। তিনি আমাকে ভাই বলে ডাকেন। সেই কারণে তার জমিতে ঘর করা হয়েছে। বাড়িটি বিক্রি করা হয়নি এবং তার কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। কেউ টাকা দেওয়ার দাবি করলে তাকে আমার কাছে আসতে বলুন।” একপর্যায়ে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, “আপনাকে এসব কে বলেছে?”

এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি সম্পদ পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সুত্র – দৈনিক মাথাভাঙ্গা