০১:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ছে , কমতে পারে পরিমাণও

কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি। তবে সব পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানো হবে না। কিছু পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখে ওজন কমিয়ে মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে।

বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বিশেষ করে পাউরুটি, বিস্কুট ও কেকের মতো নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ব্যয় আরও বাড়বে। আবার কিছু পণ্যের ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হলে একই দামে আগের তুলনায় কম পরিমাণ পণ্য কিনতে হতে পারে। এতে চাহিদা অপূর্ণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

একজন ভোক্তা বলেন, ‘বর্ধিত দামের সঙ্গে আমাদের সমন্বয় করতে হলে আয়ও বাড়া জরুরি। আয় না বাড়লে হয়তো ভোগ কমাতে হবে। তখন ব্যবসায়ীদেরও বিক্রি কমে যেতে পারে।’

আরেক ভোক্তা বলেন, ‘শিশুরা রুটি-বিস্কুট খায়। সকাল-বিকেল সব সময়ই এসব লাগে। আগে যে দামে নিতাম, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে। নতুন করে দাম বাড়লে যদি আরো বেশি দিয়ে কিনতে হয়, সেটি আমাদের জন্য কষ্টকর হবে। আর দাম না বাড়িয়ে যদি রুটের সাইজ ছোট করা হয়, তাহলেও শিশুর জন্য তা যথেষ্ট হবে না।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয় এবং শ্রমিকদের মজুরির চাপ একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আরও অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারেন। উৎপাদন ব্যয় কমাতে কাঁচামালের বাজার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রুটি, বিস্কুট, কেক, বাটার বনসহ সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিছু পণ্যের ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হবে। আবার কিছু পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানো হবে। সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

dhakapost

তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০২২ সালে করোনার পর একবার বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এরপর আবার সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার এই উদ্যোগ নিতে হয়েছে।

বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান সমিতির সভাপতি। তার ভাষ্য, উৎপাদন খরচ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় সমিতির সদস্যরা সম্মিলিতভাবে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

উৎপাদন ব্যয় বাড়ার চিত্র তুলে ধরে জালাল উদ্দিন বলেন, ময়দার বস্তার দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। তেলের ড্রামের দাম ২৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ হাজার টাকা হয়েছে। চিনির দামও বেড়ে ৫ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিলও বেড়েছে। আগে ১২ হাজার টাকা বিল হলে এখন তা ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আসছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার বলছে, ১৫ শতাংশ বিল বাড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের তো ৫০ শতাংশ বিল বেশি আসছে। আবার লাইনের গ্যাসও পাওয়া যায় না, সিলিন্ডার কিনতে হয় বেশি দাম দিয়ে। এসব কারণে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে বেকারিগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। আগে ভোরের আলো ফোটার আগেই যেসব বেকারিতে পাউরুটি, কেক, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ শুরু হতো, এখন অনেক কারখানাকে দিনের বড় একটি সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ছোট উদ্যোক্তারা।

রাজধানীর মিরপুরের একজন বেকারি উদ্যোক্তা বলেন, ‘নয়টার পরে গ্যাস অনেকটা কমে যায়, গ্যাস থাকে না। বিদ্যুতেরও সংকট। এতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কাঁচামালের দাম বাড়ছে। তেলের দামও বেড়েছে। পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতনও বেড়েছে।’

ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এক মাসের ব্যবধানে খোলা ও প্যাকেটজাত চিনির দাম কেজিতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। আটা ও ময়দার দামও কেজিতে প্রায় ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে। ফলে পাউরুটি, বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার ছোট উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেয় না। বড় শিল্প উদ্যোক্তাদের ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হলেও ছোট উদ্যোক্তারা নিজেদের সারা জীবনের সঞ্চয় ও জমি-জমা বিক্রির টাকা দিয়ে ব্যবসা করেন।

তিনি বলেন, ‘এই ব্যবসায় যদি লোকসান করতে হয়, তাহলে তো আমাদের কিছুই থাকবে না। আমাদের অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসানের জন্য কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা এই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ক্ষুদ্র বেকারি আছে প্রায় সাত হাজার। এর মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে সাত শতাধিক। দাম সমন্বয়ের পরও যদি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বেকারি খাত ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সমিতির নেতারা।

এএইচ

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ছে , কমতে পারে পরিমাণও

শনিবার থেকে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ছে , কমতে পারে পরিমাণও

প্রকাশের সময় : ০১:৪৯:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি। তবে সব পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানো হবে না। কিছু পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখে ওজন কমিয়ে মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে।

বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বিশেষ করে পাউরুটি, বিস্কুট ও কেকের মতো নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ব্যয় আরও বাড়বে। আবার কিছু পণ্যের ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হলে একই দামে আগের তুলনায় কম পরিমাণ পণ্য কিনতে হতে পারে। এতে চাহিদা অপূর্ণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

একজন ভোক্তা বলেন, ‘বর্ধিত দামের সঙ্গে আমাদের সমন্বয় করতে হলে আয়ও বাড়া জরুরি। আয় না বাড়লে হয়তো ভোগ কমাতে হবে। তখন ব্যবসায়ীদেরও বিক্রি কমে যেতে পারে।’

আরেক ভোক্তা বলেন, ‘শিশুরা রুটি-বিস্কুট খায়। সকাল-বিকেল সব সময়ই এসব লাগে। আগে যে দামে নিতাম, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে। নতুন করে দাম বাড়লে যদি আরো বেশি দিয়ে কিনতে হয়, সেটি আমাদের জন্য কষ্টকর হবে। আর দাম না বাড়িয়ে যদি রুটের সাইজ ছোট করা হয়, তাহলেও শিশুর জন্য তা যথেষ্ট হবে না।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয় এবং শ্রমিকদের মজুরির চাপ একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আরও অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারেন। উৎপাদন ব্যয় কমাতে কাঁচামালের বাজার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রুটি, বিস্কুট, কেক, বাটার বনসহ সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিছু পণ্যের ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হবে। আবার কিছু পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানো হবে। সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

dhakapost

তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০২২ সালে করোনার পর একবার বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। এরপর আবার সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার এই উদ্যোগ নিতে হয়েছে।

বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান সমিতির সভাপতি। তার ভাষ্য, উৎপাদন খরচ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় সমিতির সদস্যরা সম্মিলিতভাবে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

উৎপাদন ব্যয় বাড়ার চিত্র তুলে ধরে জালাল উদ্দিন বলেন, ময়দার বস্তার দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। তেলের ড্রামের দাম ২৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ হাজার টাকা হয়েছে। চিনির দামও বেড়ে ৫ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিলও বেড়েছে। আগে ১২ হাজার টাকা বিল হলে এখন তা ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আসছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার বলছে, ১৫ শতাংশ বিল বাড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের তো ৫০ শতাংশ বিল বেশি আসছে। আবার লাইনের গ্যাসও পাওয়া যায় না, সিলিন্ডার কিনতে হয় বেশি দাম দিয়ে। এসব কারণে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে বেকারিগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। আগে ভোরের আলো ফোটার আগেই যেসব বেকারিতে পাউরুটি, কেক, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ শুরু হতো, এখন অনেক কারখানাকে দিনের বড় একটি সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ছোট উদ্যোক্তারা।

রাজধানীর মিরপুরের একজন বেকারি উদ্যোক্তা বলেন, ‘নয়টার পরে গ্যাস অনেকটা কমে যায়, গ্যাস থাকে না। বিদ্যুতেরও সংকট। এতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কাঁচামালের দাম বাড়ছে। তেলের দামও বেড়েছে। পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতনও বেড়েছে।’

ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এক মাসের ব্যবধানে খোলা ও প্যাকেটজাত চিনির দাম কেজিতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। আটা ও ময়দার দামও কেজিতে প্রায় ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে। ফলে পাউরুটি, বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার ছোট উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেয় না। বড় শিল্প উদ্যোক্তাদের ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হলেও ছোট উদ্যোক্তারা নিজেদের সারা জীবনের সঞ্চয় ও জমি-জমা বিক্রির টাকা দিয়ে ব্যবসা করেন।

তিনি বলেন, ‘এই ব্যবসায় যদি লোকসান করতে হয়, তাহলে তো আমাদের কিছুই থাকবে না। আমাদের অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসানের জন্য কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা এই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ক্ষুদ্র বেকারি আছে প্রায় সাত হাজার। এর মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে সাত শতাধিক। দাম সমন্বয়ের পরও যদি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বেকারি খাত ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সমিতির নেতারা।

এএইচ