চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছী গ্রামের পালপাড়ায় একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৯০ বছর বয়সী বিধবা নারী সন্ধ্যা রানী। স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় ৭০ শতক জমি জাল দলিল, ভুয়া মালিকানা দাবি এবং খারিজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়ে হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
সন্ধ্যা রানী জানান, জীবনে তিনি কখনো কোনো জমি বিক্রি করেননি কিংবা কাউকে রেজিস্ট্রি করে দেননি। অথচ বিভিন্ন কাগজপত্র ও দলিলের মাধ্যমে তার নামে থাকা জমি অন্যের নামে চলে গেছে। এখন নিজের জমি ফিরে পাওয়ার আশায় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি।
ভূমি রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র সূত্রে জানা যায়, আলমডাঙ্গা উপজেলার ৭৯ নম্বর বেলগাছী মৌজার আরএস খতিয়ান নং-২১৭৮ এর অধীনে আরএস ৩৭৯৭ দাগে ৪৫ শতক কৃষিজমি এবং আরএস ৪০১৩ দাগে ২৫ শতক বসতভিটাসহ মোট ৭০ শতক জমি নিতাই পালের নামে রেকর্ডভুক্ত ছিল। ১৯৮২ সালে নিতাই পাল ওই সম্পত্তি আইনগতভাবে তার স্ত্রী সন্ধ্যা রানীর নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। এরপর দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যা রানী নিজেই জমির ভোগদখল ও খাজনা প্রদান করে আসছিলেন।
স্বামীর মৃত্যুর পরও তিনি একাই জমির দেখভাল করতেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালে খাজনা পরিশোধ করেন। তবে ২০১৭ সালে পুনরায় খাজনা দিতে গিয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে জানতে পারেন, জমিটি আর তার নামে নেই।
পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, একই গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম ইলা ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর তার বোন রুশিয়া খাতুনের কাছ থেকে জমিটি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন বলে দলিলে উল্লেখ রয়েছে। বিতর্কের বিষয় হলো, দলিল অনুযায়ী রুশিয়া খাতুন ১৯৭৫ সালে নিতাই পালের কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছিলেন। অথচ রুশিয়া খাতুন নিজেই দাবি করেছেন, তার প্রকৃত জন্ম ১৯৭৫ সালে। যদিও জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মসাল ১৯৬৫ উল্লেখ রয়েছে।
রুশিয়া খাতুন বলেন, “এই জমির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি কোনো জমি কিনিনি। আমার প্রকৃত জন্মসাল ১৯৭৫, তবে পরিচয়পত্রে ভুলবশত ১৯৬৫ লেখা হয়েছে।” তার ছেলে বলেন, “মায়ের নামে কীভাবে জমি হয়েছে তা আমরা জানি না। তবে একজন অসহায় বৃদ্ধার সঙ্গে এমন ঘটনা হওয়া উচিত নয়।”
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে সাইফুল ইসলাম ইলা জমিটি নিজের নামে খারিজ করে নেন এবং ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পোয়ামারী গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছেলে মজনু ওরফে ঝন্টুর কাছে বিক্রি করে দেন।
ঘটনাটি এলাকায় আলোচনার জন্ম দিলে ২০২২ সালে সন্ধ্যা রানী আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে আলমডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশীষ কুমার বসু তদন্ত প্রতিবেদন আহ্বান করেন। পরে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের পক্ষ নেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, সন্ধ্যা রানীর দুর্দশা দেখে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তার জন্য একটি ঘর ও একটি টিউবওয়েল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন সন্ধ্যা রানী। ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে বসবাস করা এই বৃদ্ধার দেখভালের মতো কেউ নেই। মামলার জটিলতা এবং বিভিন্ন চাপের কারণে অনেকেই তার পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সন্ধ্যা রানী বলেন, “আমার কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। স্বামী মারা যাওয়ার আগে জমিটা আমার নামে লিখে দিয়ে গেছেন। সেই জমির এক কোণে ছোট্ট ঘর তুলে থাকতাম। এখন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খেয়ে বেঁচে আছি। নিজের জমিটুকুও আর নেই। আমি কোনোদিন রেজিস্ট্রি অফিসে যাইনি, কাউকে জমিও দিইনি। যারা আমাকে ভূমি অফিসে সাহায্য করতে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের নামেও মামলা হয়েছে। এখন কেউ আমার পাশে দাঁড়াতে চায় না।”
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসহায় এই বৃদ্ধা এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তার একটাই প্রত্যাশা—সত্য উদঘাটিত হবে এবং তিনি ফিরে পাবেন স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকু।
এএইচ
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 























