চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদী ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে বিল নিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের বলিষ্ঠ ও যুগান্তকারী মধ্যস্থতায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ মীমাংসার পথে এগিয়েছে। ফলে স্বস্তি ফিরে এসেছে পুরো গ্রামে। পুলিশের এ সফল উদ্যোগে উচ্ছ্বসিত গ্রামবাসীরা মিষ্টি বিতরণ করেছেন এবং দীর্ঘদিন পর গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কেশবপুর গ্রামের একটি বিলের মালিকানা ও লিজকে কেন্দ্র করে ‘সালাম গ্রুপ’ এবং ‘মনসুর আলী চেঙ্গিস খান গ্রুপ’-এর মধ্যে প্রায় ২৫ বছর ধরে তীব্র বিরোধ চলে আসছিল। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ২২টি মামলা আদালত ও থানায় চলমান রয়েছে। সংঘাতের জেরে বহু হতাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক ও অস্থিরতার মধ্যে বসবাস করতে হয়েছে এলাকার সাধারণ মানুষকে।
বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর বিরোধকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, গ্রামবাসীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে থাকে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়।
এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের সার্বিক দিকনির্দেশনায় বিরোধ মীমাংসার প্রক্রিয়ায় সরাসরি নেতৃত্ব দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান। রাজনৈতিক সহযোগিতায় আরও গতিশীল হয় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
গত শনিবার (২০ জুন) রাতে আলমডাঙ্গা থানায় উভয় পক্ষকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রোকন এবং সাবেক সভাপতি শহিদুল কাউনাইন টিলু। আলোচনায় উভয় পক্ষই বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন এবং দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নিরসনে সম্মত হন।
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বাণী ইসরাঈল বলেন, “কেশবপুর গ্রামের দীর্ঘদিনের এই সামাজিক দ্বন্দ্ব নিরসনে পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশনায় আমরা উভয় পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্যার গ্রামবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এখন থেকে সালাম ও চেঙ্গিস নিজেরা বসে বাকি বিষয়গুলো সমাধান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জেলা পুলিশ এ শান্তি প্রক্রিয়া বজায় রাখতে সার্বিক সহযোগিতা করবে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা উভয় পক্ষকে নিয়ে বসেছিলাম এবং আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ২৫ বছর ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে আমাদের আরও আগেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও দীর্ঘদিনের এই রক্তক্ষয়ী বিরোধ এখন সম্পূর্ণ সমাপ্তির পথে।”
গ্রামবাসীরা জানান, আগামী মঙ্গলবার উভয় পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত আপোষনামা স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে সালাম ও চেঙ্গিস খান গ্রামে এসে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারা নিজেরাই আলোচনার মাধ্যমে সব বিরোধ মীমাংসা করবেন এবং কোনো গ্রামবাসীকে আর এ বিরোধে জড়ানো হবে না।
দীর্ঘদিনের এই সামাজিক দ্বন্দ্বের সফল মীমাংসায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন কেশবপুরের সাধারণ মানুষ। তারা জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, পুলিশের আন্তরিক ও দূরদর্শী উদ্যোগের কারণেই আজ গ্রামে শান্তি ফিরে এসেছে।
সমঝোতা বৈঠক শেষে থানার সামনে উপস্থিত শতাধিক গ্রামবাসী স্লোগানের মাধ্যমে জেলা পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরে কেশবপুর গ্রামেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর গ্রামটিতে ফিরে এসেছে সম্প্রীতির সুবাতাস, আর নতুন প্রজন্ম দেখছে সংঘাতমুক্ত এক শান্তির কেশবপুর।
মেহেরাব/এএইচ
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 





















