০৪:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা এন. এন. সাহার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জাতীয় সম্মাননার দাবিতে চুয়াডাঙ্গায় সংবাদ সম্মেলন

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক ও চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান প্রয়াত এন. এন. সাহার যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা এবং তাঁর অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে চুয়াডাঙ্গা শহরের ফেরিঘাট সড়কস্থ সত্যনারায়ণ মন্দিরের হলরুমে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন প্রয়াত এন. এন. সাহার পরিবারের সদস্যরা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এন. এন. সাহার বড় ছেলে সন্তোষ সাহা, সেজো ছেলে চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু, ছোট ছেলে রতন লাল সাহা, নাতি স্বপন সাহা, সুমন সাহা ও মিলন সাহা। এছাড়া প্রপৌত্র অঞ্জন সাহা আবির, আদ্র সাহা অংকন এবং সায়ন্ত সাহা উপস্থিত ছিলেন।


লিখিত বক্তব্যে পরিবারের সদস্যরা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা ছিলেন এন. এন. সাহা। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় পরিচয় নির্মাণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও তিনি প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেননি।

তারা বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ সচিবালয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, আদালত এবং সরকারি নথিপত্রে যে রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি এন. এন. সাহার নকশা করা। অথচ রাষ্ট্রের সর্বত্র তাঁর সৃষ্টি ব্যবহৃত হলেও ইতিহাসে তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে এন. এন. সাহার রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম প্রণয়নের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনে প্রথমে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের জন্য একটি মনোগ্রামযুক্ত সিলমোহরের নকশা প্রস্তুত করেন এন. এন. সাহা। পরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই নকশায় পরিবর্তন এনে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” শিরোনামে রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের চূড়ান্ত নকশা তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের সরকারি রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এন. এন. সাহার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালায়। পরে তিনি পরিবার নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এসব ত্যাগ ও অবদানও রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

সংবাদ সম্মেলনে এন. এন. সাহার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির লক্ষ্যে সরকারের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় উপাধি ও সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা প্রদান; মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ; চুয়াডাঙ্গার ফেরিঘাট সড়কের নাম “বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক ও রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা এন. এন. সাহা সড়ক” নামকরণ; পরিবারের দখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা; ২ এপ্রিলকে “রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম দিবস” ঘোষণা; চুয়াডাঙ্গায় রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম সম্বলিত ইতিহাস স্তম্ভ বা স্মারক নির্মাণ এবং এন. এন. সাহার জীবন, কর্ম ও অবদান নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জেলা প্রশাসন, ইতিহাসবিদ, গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়াত এন. এন. সাহার অবদানকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে ইতিহাসের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হোক।

তারা বলেন, একজন মানুষের সৃষ্টি আজ রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু সেই সৃষ্টির প্রণেতা এখনও প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। তাই তাঁর অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান তারা।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় দুই মামলায় তিনজনের যাবজ্জীবন

রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা এন. এন. সাহার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জাতীয় সম্মাননার দাবিতে চুয়াডাঙ্গায় সংবাদ সম্মেলন

প্রকাশের সময় : ০৮:৩৭:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক ও চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান প্রয়াত এন. এন. সাহার যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা এবং তাঁর অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে চুয়াডাঙ্গা শহরের ফেরিঘাট সড়কস্থ সত্যনারায়ণ মন্দিরের হলরুমে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন প্রয়াত এন. এন. সাহার পরিবারের সদস্যরা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এন. এন. সাহার বড় ছেলে সন্তোষ সাহা, সেজো ছেলে চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু, ছোট ছেলে রতন লাল সাহা, নাতি স্বপন সাহা, সুমন সাহা ও মিলন সাহা। এছাড়া প্রপৌত্র অঞ্জন সাহা আবির, আদ্র সাহা অংকন এবং সায়ন্ত সাহা উপস্থিত ছিলেন।


লিখিত বক্তব্যে পরিবারের সদস্যরা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা ছিলেন এন. এন. সাহা। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় পরিচয় নির্মাণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও তিনি প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেননি।

তারা বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ সচিবালয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, আদালত এবং সরকারি নথিপত্রে যে রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি এন. এন. সাহার নকশা করা। অথচ রাষ্ট্রের সর্বত্র তাঁর সৃষ্টি ব্যবহৃত হলেও ইতিহাসে তাঁর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে এন. এন. সাহার রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম প্রণয়নের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রয়োজনে প্রথমে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের জন্য একটি মনোগ্রামযুক্ত সিলমোহরের নকশা প্রস্তুত করেন এন. এন. সাহা। পরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই নকশায় পরিবর্তন এনে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” শিরোনামে রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের চূড়ান্ত নকশা তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের সরকারি রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এন. এন. সাহার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালায়। পরে তিনি পরিবার নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এসব ত্যাগ ও অবদানও রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

সংবাদ সম্মেলনে এন. এন. সাহার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির লক্ষ্যে সরকারের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় উপাধি ও সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা প্রদান; মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ; চুয়াডাঙ্গার ফেরিঘাট সড়কের নাম “বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক ও রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের প্রণেতা এন. এন. সাহা সড়ক” নামকরণ; পরিবারের দখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা; ২ এপ্রিলকে “রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম দিবস” ঘোষণা; চুয়াডাঙ্গায় রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম সম্বলিত ইতিহাস স্তম্ভ বা স্মারক নির্মাণ এবং এন. এন. সাহার জীবন, কর্ম ও অবদান নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জেলা প্রশাসন, ইতিহাসবিদ, গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়াত এন. এন. সাহার অবদানকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে ইতিহাসের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হোক।

তারা বলেন, একজন মানুষের সৃষ্টি আজ রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু সেই সৃষ্টির প্রণেতা এখনও প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। তাই তাঁর অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান তারা।