০১:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় চাল-ডালের বাজারে আগুন, চাপে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত

  • আশিকুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ১২:৪৫:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫০৫ Views

চুয়াডাঙ্গার বাজারে চাল ও ডালের দাম বৃদ্ধিতে বাড়ছে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস। একদিকে মুগ, কলাই, মসুর ও ছোলার ডালের কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা পর্যন্ত, অন্যদিকে চালের প্রতিটি ২৫ কেজির বস্তায় বেড়েছে ৫০ টাকা। একই সঙ্গে মাছ, মুরগি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামের ওঠানামায় সংসারের খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আয় না বাড়লেও প্রতিদিনের বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেরই কমাতে হচ্ছে কেনাকাটার পরিমাণ।

চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজারে গত দুই দিন ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন একাধিক মাছ ব্যবসায়ী। তবে বাজারে সব পণ্যের চিত্র এক নয়। মুরগির কয়েকটি জাতের দাম বেড়েছে, চাল-ডালের বাজারে দেখা দিয়েছে ঊর্ধ্বগতি। সবজির মধ্যে কিছু পণ্যের দাম কমলেও কয়েকটির দাম বেড়েছে। ফলে কোনো একটি পণ্যের দাম কমার স্বস্তি অন্য পণ্যের বাড়তি দামের চাপে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

বাজারে আসা মানুষের বড় অংশের অভিযোগ, আগে যে পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে এসে চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত, এখন সেই টাকায় আগের সমপরিমাণ পণ্য মিলছে না। ফলে প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। অনেক পরিবারকে কম পরিমাণে কিনে কোনোভাবে দিন চালাতে হচ্ছে।


বড় বাজারের মুদি ব্যবসায়ী হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, কয়েক ধরনের ডালের দাম হঠাৎ করেই বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি মুগের ডাল ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৭০ টাকা। কলাইয়ের ডাল ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। ভালো মানের মসুর ডালের দাম ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়। একইভাবে ছোলার ডাল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে।

তিনি বলেন, শুধু ডাল নয়, মসলা থেকে শুরু করে শিশুদের দুধসহ অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা— উভয় পক্ষই সমস্যায় পড়ছেন। ক্রেতারা আগের দামের হিসাব করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে আসেন। কিন্তু দোকানে এসে দাম বেশি দেখে সেই টাকায় প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারেন না। অনেকে কম পরিমাণে কেনেন, আবার কেউ কেউ পণ্য না কিনেই ফিরে যান।

হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, দ্রব্যমূল্যের এই বৃদ্ধিতে আমরাও যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছি। ক্রেতারা প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে এসে টাকার অভাবে ফিরে যাচ্ছেন। এতে আমাদের ব্যবসায়ও ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করা হোক।


বড় বাজারের চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালের দামেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। ভালো মানের বাসমতি চাল পাইকারিতে কেজিপ্রতি ৭৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৬৬ টাকা। রড মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা কেজি দরে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের চালের ২৫ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা করে দাম বেড়েছে। এছাড়া সব রকমের মসলাতেও ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

চাল-ডালের মতো প্রতিদিনের খাবারের অপরিহার্য উপকরণের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। যাদের আয়ের বড় অংশই খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হয়, তাঁদের জন্য সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে দিনমজুর ও পরিবহন শ্রমিকদের জীবনেও। রিকশাচালক শাহাজান বলেন, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের আয় আগের মতোই রয়েছে। বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়ছে না। তাহলে আমরা কীভাবে চলব? প্রতিদিন যা আয় করি, তা দিয়ে খাবার কিনে পরিবারের অন্য খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

আরেক রিকশাচালক জালাল উদ্দিন বলেন, ইজিবাইকের কারণে তাদের রিকশায় আগের মতো ভাড়া হচ্ছে না। তার ওপর চাল, ডাল ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। আয় না বাড়ায় সংসারের খরচ মেটাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তাদের মতো দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বাজারের বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে কাজ ও যাত্রী কমে আয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়।


চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারের এক মুরগি ব্যবসায়ী বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়েনি। তবে লেয়ার, সোনালি ও দেশি মুরগিসহ কয়েক ধরনের মুরগির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

অন্যদিকে, এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, গত মাসের তুলনায় বর্তমানে মাছের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে তার দাবি। তবে দাম কমার পরও ক্রেতা কম বলে জানান তিনি। বাজারে ক্রেতাদের কেনাকাটা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারছেন না।


বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলু বিক্রি হচ্ছে কেজি ২৫ টাকা দরে, যা আগের তুলনায় ৫ টাকা বেশি। পেঁয়াজের দাম ৫০ টাকা কেজি। রসুনের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা হয়েছে। অন্যদিকে, আদার দাম কেজিতে ৫০ টাকা কমে ২০০ টাকা হয়েছে।

কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। টমেটোর দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, গাজরের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা কমে ১৬০ টাকা এবং ফুলকপির দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা কমে ৬০ টাকা হয়েছে। তবে বাঁধাকপির দাম ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে।

শিমের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা হয়েছে। শসা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং কাঁচা কলা ৩০ টাকা কেজি দরে। লাউয়ের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, লালশাক ১০ টাকা, ছোলার শাক ১২০ টাকা কেজি, পটল ৩০ টাকা, উচ্ছে ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং ঝিঙে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।


বড় বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজি ২০০ টাকা দরে। সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৩২০ টাকা, লেয়ার মুরগির দাম ২০ টাকা বেড়ে ৩৭০ টাকা এবং পেরেন্স মুরগির দাম ২০ টাকা বেড়ে ৩৮০ টাকা হয়েছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজি ৮০০ টাকা দরে। খাসির মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।


চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারে বড় রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে কেজি ৫০০ টাকা দরে। আগের তুলনায় দাম কমেছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। ছোট রুইয়ের দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা কমে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা হয়েছে। বড় কাতলার দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কমে ৫০০ টাকা এবং ছোট কাতলার দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকা কমে ২৮০ টাকা হয়েছে।

গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা কমে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা হয়েছে। পাঙাশের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, সিলভার কার্পের দাম ২০ থেকে ৪০ টাকা কমে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং ছোট কই মাছের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা হয়েছে।


বাজারে ডিমের খাঁচি বিক্রি হচ্ছে ৩১০ টাকা দরে। প্রতি হালি ডিমের দাম ৪৪ টাকা। চাল, ডাল ও অন্যান্য খাবারের উপকরণের সঙ্গে ডিমের খরচ যোগ হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর বাজারের বাজেট আরও চাপে পড়ছে।


চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কিছু মাছ ও সবজির দাম কমলেও চাল, ডাল, কয়েক ধরনের মুরগি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে খাবার ও সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোরও মাসিক খরচের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে উঠছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে এসে পণ্যের দাম শুনে অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিসের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন একই টাকায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে খাবারের তালিকা থেকে কিছু পণ্য বাদ দেওয়া কিংবা কম পরিমাণে কেনার মাধ্যমে সংসারের খরচ সামলাতে হচ্ছে অনেককে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

আলমডাঙ্গায় প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে ফু র্তি : ধা ও য়া খে য়ে পরনের লুঙ্গি-স্যান্ডেল ফেলে পালালেন সোহেল

চুয়াডাঙ্গায় চাল-ডালের বাজারে আগুন, চাপে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত

প্রকাশের সময় : ১২:৪৫:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

চুয়াডাঙ্গার বাজারে চাল ও ডালের দাম বৃদ্ধিতে বাড়ছে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস। একদিকে মুগ, কলাই, মসুর ও ছোলার ডালের কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা পর্যন্ত, অন্যদিকে চালের প্রতিটি ২৫ কেজির বস্তায় বেড়েছে ৫০ টাকা। একই সঙ্গে মাছ, মুরগি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামের ওঠানামায় সংসারের খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আয় না বাড়লেও প্রতিদিনের বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেরই কমাতে হচ্ছে কেনাকাটার পরিমাণ।

চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজারে গত দুই দিন ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন একাধিক মাছ ব্যবসায়ী। তবে বাজারে সব পণ্যের চিত্র এক নয়। মুরগির কয়েকটি জাতের দাম বেড়েছে, চাল-ডালের বাজারে দেখা দিয়েছে ঊর্ধ্বগতি। সবজির মধ্যে কিছু পণ্যের দাম কমলেও কয়েকটির দাম বেড়েছে। ফলে কোনো একটি পণ্যের দাম কমার স্বস্তি অন্য পণ্যের বাড়তি দামের চাপে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

বাজারে আসা মানুষের বড় অংশের অভিযোগ, আগে যে পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে এসে চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত, এখন সেই টাকায় আগের সমপরিমাণ পণ্য মিলছে না। ফলে প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। অনেক পরিবারকে কম পরিমাণে কিনে কোনোভাবে দিন চালাতে হচ্ছে।


বড় বাজারের মুদি ব্যবসায়ী হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, কয়েক ধরনের ডালের দাম হঠাৎ করেই বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি মুগের ডাল ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৭০ টাকা। কলাইয়ের ডাল ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। ভালো মানের মসুর ডালের দাম ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়। একইভাবে ছোলার ডাল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে।

তিনি বলেন, শুধু ডাল নয়, মসলা থেকে শুরু করে শিশুদের দুধসহ অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা— উভয় পক্ষই সমস্যায় পড়ছেন। ক্রেতারা আগের দামের হিসাব করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে আসেন। কিন্তু দোকানে এসে দাম বেশি দেখে সেই টাকায় প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারেন না। অনেকে কম পরিমাণে কেনেন, আবার কেউ কেউ পণ্য না কিনেই ফিরে যান।

হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, দ্রব্যমূল্যের এই বৃদ্ধিতে আমরাও যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছি। ক্রেতারা প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে এসে টাকার অভাবে ফিরে যাচ্ছেন। এতে আমাদের ব্যবসায়ও ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করা হোক।


বড় বাজারের চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালের দামেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। ভালো মানের বাসমতি চাল পাইকারিতে কেজিপ্রতি ৭৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৬৬ টাকা। রড মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা কেজি দরে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের চালের ২৫ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা করে দাম বেড়েছে। এছাড়া সব রকমের মসলাতেও ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

চাল-ডালের মতো প্রতিদিনের খাবারের অপরিহার্য উপকরণের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। যাদের আয়ের বড় অংশই খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হয়, তাঁদের জন্য সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।


বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে দিনমজুর ও পরিবহন শ্রমিকদের জীবনেও। রিকশাচালক শাহাজান বলেন, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়লেও তাদের আয় আগের মতোই রয়েছে। বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়ছে না। তাহলে আমরা কীভাবে চলব? প্রতিদিন যা আয় করি, তা দিয়ে খাবার কিনে পরিবারের অন্য খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

আরেক রিকশাচালক জালাল উদ্দিন বলেন, ইজিবাইকের কারণে তাদের রিকশায় আগের মতো ভাড়া হচ্ছে না। তার ওপর চাল, ডাল ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। আয় না বাড়ায় সংসারের খরচ মেটাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তাদের মতো দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বাজারের বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে কাজ ও যাত্রী কমে আয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়।


চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারের এক মুরগি ব্যবসায়ী বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়েনি। তবে লেয়ার, সোনালি ও দেশি মুরগিসহ কয়েক ধরনের মুরগির দাম কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

অন্যদিকে, এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, গত মাসের তুলনায় বর্তমানে মাছের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে তার দাবি। তবে দাম কমার পরও ক্রেতা কম বলে জানান তিনি। বাজারে ক্রেতাদের কেনাকাটা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারছেন না।


বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলু বিক্রি হচ্ছে কেজি ২৫ টাকা দরে, যা আগের তুলনায় ৫ টাকা বেশি। পেঁয়াজের দাম ৫০ টাকা কেজি। রসুনের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা হয়েছে। অন্যদিকে, আদার দাম কেজিতে ৫০ টাকা কমে ২০০ টাকা হয়েছে।

কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। টমেটোর দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, গাজরের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা কমে ১৬০ টাকা এবং ফুলকপির দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা কমে ৬০ টাকা হয়েছে। তবে বাঁধাকপির দাম ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে।

শিমের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা হয়েছে। শসা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং কাঁচা কলা ৩০ টাকা কেজি দরে। লাউয়ের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, লালশাক ১০ টাকা, ছোলার শাক ১২০ টাকা কেজি, পটল ৩০ টাকা, উচ্ছে ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং ঝিঙে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।


বড় বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজি ২০০ টাকা দরে। সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৩২০ টাকা, লেয়ার মুরগির দাম ২০ টাকা বেড়ে ৩৭০ টাকা এবং পেরেন্স মুরগির দাম ২০ টাকা বেড়ে ৩৮০ টাকা হয়েছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজি ৮০০ টাকা দরে। খাসির মাংসের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।


চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারে বড় রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে কেজি ৫০০ টাকা দরে। আগের তুলনায় দাম কমেছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। ছোট রুইয়ের দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা কমে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা হয়েছে। বড় কাতলার দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কমে ৫০০ টাকা এবং ছোট কাতলার দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকা কমে ২৮০ টাকা হয়েছে।

গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা কমে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা হয়েছে। পাঙাশের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, সিলভার কার্পের দাম ২০ থেকে ৪০ টাকা কমে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং ছোট কই মাছের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা হয়েছে।


বাজারে ডিমের খাঁচি বিক্রি হচ্ছে ৩১০ টাকা দরে। প্রতি হালি ডিমের দাম ৪৪ টাকা। চাল, ডাল ও অন্যান্য খাবারের উপকরণের সঙ্গে ডিমের খরচ যোগ হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর বাজারের বাজেট আরও চাপে পড়ছে।


চুয়াডাঙ্গার বড় বাজারের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কিছু মাছ ও সবজির দাম কমলেও চাল, ডাল, কয়েক ধরনের মুরগি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে খাবার ও সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোরও মাসিক খরচের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে উঠছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে এসে পণ্যের দাম শুনে অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিসের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন একই টাকায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে খাবারের তালিকা থেকে কিছু পণ্য বাদ দেওয়া কিংবা কম পরিমাণে কেনার মাধ্যমে সংসারের খরচ সামলাতে হচ্ছে অনেককে।