০১:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ শীর্ষক সেমিনার: সংস্কৃতি সুরক্ষায় ঐক্যের আহ্বান

বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মননশীলতার চর্চা আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, এমন বাস্তবতায় চুয়াডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার।

দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ পত্রিকার আয়োজনে ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভা শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) বিকেলে শহরের পুলিশ পার্ক লেনে পত্রিকাটির প্রধান কার্যালয়ের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে দেশের সাংস্কৃতিক পটভূমি, সাম্প্রতিক সংকট, অসহিষ্ণুতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে গভীর ও বহুমাত্রিক আলোচনা হয়। দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ-এর প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন–এর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল মোহিত।

সেমিনারের শুরুতেই দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ-এর কর্মী সাংবাদিক মেহেরাব্বিন সানভী তাঁর স্বরচিত মূল প্রবন্ধ ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ পাঠ করেন। প্রবন্ধে তিনি তুলে ধরেন—বহুত্ববাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্নমত ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। শিল্পী, বাউল ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের হেনস্তা এবং আক্রমণের ঘটনা সমাজের মননশীলতার উপর গভীর আঘাত হানছে।

আলোচনায় অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “বর্তমান পাঠ্যক্রমে শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিছু বাধ্যতামূলক বিষয় সংস্কৃতির সঠিক ধারাকে বিকৃত করতে পারে। সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে এখনই শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার উদ্যোগ নিতে হবে। দল–মত নির্বিশেষে সবাইকে এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুল ধারায় প্রভাবিত হবে।”

অধ্যাপক ড. আব্দুল মোহিত সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমাদের সংবিধানে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদের যে ভিত্তি রয়েছে, তা রক্ষায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক কর্মীরা সমাজের বিবেক। তাঁদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।”

সভাপতির বক্তব্যে নাজমুল হক স্বপন বলেন, “সংস্কৃতি আমাদের জাতিসত্তার মূল ভিত্তি। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের শক্তিকে একত্র করে সাংস্কৃতিক চর্চা জোরদার করতে হবে। জেলার সংস্কৃতিমনা লেখক, কবি ও শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।”

খোদাবকস শাহ স্মৃতি পরিষদের সভাপতি আব্দুল লতিফ শাহ বলেন, “চুয়াডাঙ্গা আউল-বাউল, জারি-সারি ও লোকগীতির সমৃদ্ধ ভূমি। আধুনিকতার নামে সংস্কৃতি ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এই ঐতিহ্য রক্ষা সম্ভব নয়।”

অনির্বান থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, “এই সংকট শুধু শিল্পের নয়—এটি আমাদের সামাজিক ও মানবিক ভিত্তির সংকট। মুক্তবুদ্ধি ও লোকায়ত সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।”

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ-এর সাহিত্য সম্পাদক কাজল মাহমুদ, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য অ্যাডভোকেট বজলুর রহমান, আবৃত্তি পর্ষদের পরিচালক মনোয়ারা খুশী, লেখক শেখ সেলিম, কবি আবুল কালাম আজাদ, জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সেলিম, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জেলা সাধারণ সম্পাদক আদিল হোসেন, অনির্বান থিয়েটারের কবিরুল হক লিপু, মো. আলা উদ্দিন, পিন্টু রহমান, হিরন উর রশিদ শান্ত, রিগ্যান এসকান্দার, মো. আওয়াল হোসেন, নজির আহমেদ, মনিরুজ্জামান মানিক, সুমিতা দে, ভারতী হালদারসহ জেলার বহু সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবী।

বক্তারা একমত হন যে, বর্তমান জটিল প্রেক্ষাপটে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে সচেতন, যুক্তিভিত্তিক ও মানবিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে অসহিষ্ণুতার গভীর কারণ অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় দুই মামলায় তিনজনের যাবজ্জীবন

চুয়াডাঙ্গায় ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ শীর্ষক সেমিনার: সংস্কৃতি সুরক্ষায় ঐক্যের আহ্বান

প্রকাশের সময় : ০৮:৫৮:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মননশীলতার চর্চা আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, এমন বাস্তবতায় চুয়াডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার।

দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ পত্রিকার আয়োজনে ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভা শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) বিকেলে শহরের পুলিশ পার্ক লেনে পত্রিকাটির প্রধান কার্যালয়ের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে দেশের সাংস্কৃতিক পটভূমি, সাম্প্রতিক সংকট, অসহিষ্ণুতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে গভীর ও বহুমাত্রিক আলোচনা হয়। দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ-এর প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন–এর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল মোহিত।

সেমিনারের শুরুতেই দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ-এর কর্মী সাংবাদিক মেহেরাব্বিন সানভী তাঁর স্বরচিত মূল প্রবন্ধ ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ পাঠ করেন। প্রবন্ধে তিনি তুলে ধরেন—বহুত্ববাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্নমত ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। শিল্পী, বাউল ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের হেনস্তা এবং আক্রমণের ঘটনা সমাজের মননশীলতার উপর গভীর আঘাত হানছে।

আলোচনায় অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “বর্তমান পাঠ্যক্রমে শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিছু বাধ্যতামূলক বিষয় সংস্কৃতির সঠিক ধারাকে বিকৃত করতে পারে। সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে এখনই শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার উদ্যোগ নিতে হবে। দল–মত নির্বিশেষে সবাইকে এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুল ধারায় প্রভাবিত হবে।”

অধ্যাপক ড. আব্দুল মোহিত সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমাদের সংবিধানে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদের যে ভিত্তি রয়েছে, তা রক্ষায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক কর্মীরা সমাজের বিবেক। তাঁদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।”

সভাপতির বক্তব্যে নাজমুল হক স্বপন বলেন, “সংস্কৃতি আমাদের জাতিসত্তার মূল ভিত্তি। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের শক্তিকে একত্র করে সাংস্কৃতিক চর্চা জোরদার করতে হবে। জেলার সংস্কৃতিমনা লেখক, কবি ও শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।”

খোদাবকস শাহ স্মৃতি পরিষদের সভাপতি আব্দুল লতিফ শাহ বলেন, “চুয়াডাঙ্গা আউল-বাউল, জারি-সারি ও লোকগীতির সমৃদ্ধ ভূমি। আধুনিকতার নামে সংস্কৃতি ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এই ঐতিহ্য রক্ষা সম্ভব নয়।”

অনির্বান থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, “এই সংকট শুধু শিল্পের নয়—এটি আমাদের সামাজিক ও মানবিক ভিত্তির সংকট। মুক্তবুদ্ধি ও লোকায়ত সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।”

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক সময়য়ের সমীকরণ-এর সাহিত্য সম্পাদক কাজল মাহমুদ, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য অ্যাডভোকেট বজলুর রহমান, আবৃত্তি পর্ষদের পরিচালক মনোয়ারা খুশী, লেখক শেখ সেলিম, কবি আবুল কালাম আজাদ, জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সেলিম, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জেলা সাধারণ সম্পাদক আদিল হোসেন, অনির্বান থিয়েটারের কবিরুল হক লিপু, মো. আলা উদ্দিন, পিন্টু রহমান, হিরন উর রশিদ শান্ত, রিগ্যান এসকান্দার, মো. আওয়াল হোসেন, নজির আহমেদ, মনিরুজ্জামান মানিক, সুমিতা দে, ভারতী হালদারসহ জেলার বহু সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবী।

বক্তারা একমত হন যে, বর্তমান জটিল প্রেক্ষাপটে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে সচেতন, যুক্তিভিত্তিক ও মানবিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে অসহিষ্ণুতার গভীর কারণ অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।