দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর অপেক্ষার পর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার গোয়ালপাড়া গ্রামের শিশু মরিয়ম খাতুন (১০) ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বহুল প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। আলোচিত এ মামলায় একমাত্র আসামি মো. আবুল হোসেন ওরফে ফটিককে (২৯) মৃত্যুদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে আরও কারাভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার পরপরই কঠোর পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে চুয়াডাঙ্গার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মোক্তাগীর আলম এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর সকাল ১১টার দিকে জীবননগর উপজেলার গোয়ালপাড়া গ্রামের ভ্যানচালক ইকবাল হোসেনের মেয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মরিয়ম খাতুন তার ছোট বোন আছিয়া খাতুন এবং প্রতিবেশী দুই শিশুকে নিয়ে স্থানীয় হাড়িভাঙ্গা মাঠে শাক তুলতে যায়। একপর্যায়ে একটি ভ্যান রেখে সেখানে উপস্থিত হয় এক ব্যক্তি। সে মরিয়মকে আরও ভালো জায়গা থেকে শাক তুলে দেওয়ার কথা বলে পাশের ভুট্টাক্ষেতের দিকে নিয়ে যায় এবং অন্য শিশুদের অপেক্ষা করতে বলে।

কিছুক্ষণ পর ওই ব্যক্তি একাই ফিরে এলে অন্য শিশুরা মরিয়মের কথা জানতে চাইলে সে জানায়, মরিয়ম পরে আসবে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় শিশুরা বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জানায়। পরে মরিয়মের মা-বাবা, স্বজন ও স্থানীয় লোকজন মাঠে গিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে স্থানীয় আলী হোসেনের ভুট্টাক্ষেত থেকে মরিয়মের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর নিহত শিশুর বাবা ইকবাল হোসেন জীবননগর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তভার পেয়ে জীবননগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম দীর্ঘ তদন্ত শেষে উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের বড় মসজিদপাড়ার আবু তাহের মোল্লার ছেলে মো. আবুল হোসেন ওরফে ফটিককে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন আসামি চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। একই সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষায়ও তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিচার চলাকালে আদালতে ৩১ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের জবানবন্দি, ডিএনএ রিপোর্ট, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে আদালত একমাত্র আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন।
গত বুধবার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ২০ জুলাই রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম. এম. শাহজাহান মুকুল রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ছিল। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ, ডিএনএ রিপোর্ট এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ে সন্তুষ্ট।”
চুয়াডাঙ্গা কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক একরাম বলেন, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কঠোর পুলিশ পাহারায় কারাগারে পাঠানো হবে।
এএইচ
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















