০৪:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লোকসান পেরিয়ে রেকর্ড মুনাফার পথে ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রতিষ্ঠান দর্শনার কেরু

Ada. Munna Telecom1

দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড দীর্ঘদিনের লোকসানের বৃত্ত ভেঙে সাফল্যের নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পর্ষদের স্বচ্ছতা, সততা, দক্ষতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বছরের পর বছর লোকসানে থাকা বিভিন্ন বিভাগ এখন লাভজনক ধারায় ফিরে এসেছে। বিশেষ করে, চলতি অর্থবছরে শতভাগ নগদ অর্থে জমি লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশাল কেরুজ কমপ্লেক্সের নিজস্ব জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৫৬ একর। এর মধ্যে কারখানা ও কলোনি রয়েছে ১৬৬ দশমিক ১৮ একর, ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র ৫ দশমিক ৩০ একর, নিজস্ব সড়ক ৪৮ দশমিক ৩৫ একর এবং শ্মশান ১ দশমিক ২৭ একর জমির ওপর অবস্থিত। এছাড়া আকন্দবাড়িয়া জৈব সার কারখানা গড়ে উঠেছে ২৭৯ দশমিক ৭২ একর জমির ওপর।

প্রতিষ্ঠানটির অধীনে বর্তমানে ১০টি কৃষি খামার রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি বাণিজ্যিক খামার। এসব খামারের মধ্যে রয়েছে হিজলগাড়ী, বেগমপুর, ফুরশেদপুর, ঝাঝরি, আড়িয়া, ফুলবাড়ী, ছয়ঘরিয়া, ঘোলদাড়ী ও ডিহিকৃষ্ণপুর। এছাড়া মিলগেটে দুটি এবং রোডভিত্তিক ৩৩টিসহ মোট ৩৫টি ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র এবং দেশব্যাপী ১৩টি দেশি মদ ও ৪টি বিদেশি মদ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্প প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পরবর্তী ৫২ বছরে সরকারের রাজস্ব খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা জমা দিয়েছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি স্মরণকালের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি অর্থবছরে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে কেরুর মুনাফা।

প্রতিষ্ঠানটির আয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে জমি লিজ ব্যবস্থাপনায় আনা মৌলিক পরিবর্তন। অতীতে বাকিতে জমি লিজ দেওয়ার কারণে নিয়মিত বকেয়া সৃষ্টি হতো এবং রাজস্ব আদায়ে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো কর্তৃপক্ষকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সম্পূর্ণ নগদ অর্থে স্বল্পমেয়াদি জমি লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর ফলে ৯টি খামারের ৭০৮ একর জমি থেকে লিজ বাবদ আদায় হয়েছে ১ কোটি ৮১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৭৪ টাকা। আকন্দবাড়িয়া পরীক্ষামূলক খামারের ব্লক বহির্ভূত ৫৯ দশমিক ২৬ একর জমি থেকে আয় হয়েছে ২৬ লাখ ৪৭ হাজার ৭৯৫ টাকা। এছাড়া উজলপুরের ২৩ দশমিক ৩৪ একর জমি থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি জমি লিজ থেকে কেরুজ কমপ্লেক্সের কোষাগারে জমা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫৯ টাকা।

জানা গেছে, লিজগ্রহীতারা গত ১৬ মার্চ থেকে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এসব জমিতে মিষ্টি কুমড়া, ধান ও পাটসহ এক ফসলি কৃষিকাজ করতে পারবেন। নির্ধারিত সময় শেষে জমিগুলো পুনরায় আখ চাষের জন্য চিনিকল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাবে।

অন্যদিকে, গত অর্থবছরে প্রায় ৬০০ একর জমি লিজ দিয়ে ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আয় হওয়ার কথা থাকলেও সম্পূর্ণ অর্থ আদায় সম্ভব হয়নি। বাকিতে লিজ দেওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব আদায়ে সমস্যায় পড়তে হতো কর্তৃপক্ষকে। এমনকি গত বছরের লিজের বকেয়া ২৬ লাখ টাকা আদায়ের জন্য উজলপুরের আসলাম আলী ও দর্শনার ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করেছে চিনিকল কর্তৃপক্ষ।

চিনিকল প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম শতভাগ নগদ অর্থে জমি লিজ প্রদানের এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “সরকারের মূল্যবান সম্পদ কেরুজ কমপ্লেক্সকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা আমাদের দায়িত্ব। আখ চাষ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্বল্পমেয়াদি জমি লিজের ক্ষেত্রেও নগদ অর্থে লেনদেন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পর্ষদ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বলেই প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি—প্রজ্ঞা, নিষ্ঠা, সততা ও পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। তবে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনার কারণে দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি আবারও দেশের অন্যতম সফল রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় পাচারকালে ২৮০ কেজি সরকারি চাল-আটা জব্দ : জরিমানার পর সেই বিএনপি নেতা বহিষ্কার

লোকসান পেরিয়ে রেকর্ড মুনাফার পথে ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রতিষ্ঠান দর্শনার কেরু

প্রকাশের সময় : ১১:১৮:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড দীর্ঘদিনের লোকসানের বৃত্ত ভেঙে সাফল্যের নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পর্ষদের স্বচ্ছতা, সততা, দক্ষতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বছরের পর বছর লোকসানে থাকা বিভিন্ন বিভাগ এখন লাভজনক ধারায় ফিরে এসেছে। বিশেষ করে, চলতি অর্থবছরে শতভাগ নগদ অর্থে জমি লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশাল কেরুজ কমপ্লেক্সের নিজস্ব জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৫৬ একর। এর মধ্যে কারখানা ও কলোনি রয়েছে ১৬৬ দশমিক ১৮ একর, ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র ৫ দশমিক ৩০ একর, নিজস্ব সড়ক ৪৮ দশমিক ৩৫ একর এবং শ্মশান ১ দশমিক ২৭ একর জমির ওপর অবস্থিত। এছাড়া আকন্দবাড়িয়া জৈব সার কারখানা গড়ে উঠেছে ২৭৯ দশমিক ৭২ একর জমির ওপর।

প্রতিষ্ঠানটির অধীনে বর্তমানে ১০টি কৃষি খামার রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি বাণিজ্যিক খামার। এসব খামারের মধ্যে রয়েছে হিজলগাড়ী, বেগমপুর, ফুরশেদপুর, ঝাঝরি, আড়িয়া, ফুলবাড়ী, ছয়ঘরিয়া, ঘোলদাড়ী ও ডিহিকৃষ্ণপুর। এছাড়া মিলগেটে দুটি এবং রোডভিত্তিক ৩৩টিসহ মোট ৩৫টি ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্র এবং দেশব্যাপী ১৩টি দেশি মদ ও ৪টি বিদেশি মদ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্প প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পরবর্তী ৫২ বছরে সরকারের রাজস্ব খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা জমা দিয়েছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি স্মরণকালের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি অর্থবছরে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে কেরুর মুনাফা।

প্রতিষ্ঠানটির আয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে জমি লিজ ব্যবস্থাপনায় আনা মৌলিক পরিবর্তন। অতীতে বাকিতে জমি লিজ দেওয়ার কারণে নিয়মিত বকেয়া সৃষ্টি হতো এবং রাজস্ব আদায়ে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো কর্তৃপক্ষকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সম্পূর্ণ নগদ অর্থে স্বল্পমেয়াদি জমি লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর ফলে ৯টি খামারের ৭০৮ একর জমি থেকে লিজ বাবদ আদায় হয়েছে ১ কোটি ৮১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৭৪ টাকা। আকন্দবাড়িয়া পরীক্ষামূলক খামারের ব্লক বহির্ভূত ৫৯ দশমিক ২৬ একর জমি থেকে আয় হয়েছে ২৬ লাখ ৪৭ হাজার ৭৯৫ টাকা। এছাড়া উজলপুরের ২৩ দশমিক ৩৪ একর জমি থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি জমি লিজ থেকে কেরুজ কমপ্লেক্সের কোষাগারে জমা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫৯ টাকা।

জানা গেছে, লিজগ্রহীতারা গত ১৬ মার্চ থেকে আগামী ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এসব জমিতে মিষ্টি কুমড়া, ধান ও পাটসহ এক ফসলি কৃষিকাজ করতে পারবেন। নির্ধারিত সময় শেষে জমিগুলো পুনরায় আখ চাষের জন্য চিনিকল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাবে।

অন্যদিকে, গত অর্থবছরে প্রায় ৬০০ একর জমি লিজ দিয়ে ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আয় হওয়ার কথা থাকলেও সম্পূর্ণ অর্থ আদায় সম্ভব হয়নি। বাকিতে লিজ দেওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব আদায়ে সমস্যায় পড়তে হতো কর্তৃপক্ষকে। এমনকি গত বছরের লিজের বকেয়া ২৬ লাখ টাকা আদায়ের জন্য উজলপুরের আসলাম আলী ও দর্শনার ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করেছে চিনিকল কর্তৃপক্ষ।

চিনিকল প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম শতভাগ নগদ অর্থে জমি লিজ প্রদানের এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “সরকারের মূল্যবান সম্পদ কেরুজ কমপ্লেক্সকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা আমাদের দায়িত্ব। আখ চাষ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্বল্পমেয়াদি জমি লিজের ক্ষেত্রেও নগদ অর্থে লেনদেন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পর্ষদ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বলেই প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি—প্রজ্ঞা, নিষ্ঠা, সততা ও পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। তবে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনার কারণে দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি আবারও দেশের অন্যতম সফল রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।