চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের হাবিবপুর গ্রামের বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সী মো. মুসাব আলী। বয়সের ভার, তবুও থেমে নেই তার পথচলা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এখনও কাঁধে মিষ্টি নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। এ নিয়েই চলে তার সংসার।
প্রয়াত বাহাজ্জেল মন্ডলের ছেলে মুসাব আলী তিন পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক। সবাই যার যার মত সংসার করছেন। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে যখন বিশ্রামে থাকার কথা, তখনই জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন তাকে নামতে হয় কঠোর পরিশ্রমে। প্রায় ২১ বছর ধরে তিনি কাঁধে বাঁকে মিষ্টি নিয়ে জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করে চলেছেন।

প্রতিদিন সকাল হলেই শুরু হয় তার কর্মযজ্ঞ। নিজ বাড়িতে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেন নানা ধরনের মিষ্টি। এরপর সেই মিষ্টি বাঁকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন গ্রামগঞ্জে। ছোট মিষ্টি ১০ টাকা এবং বড় মিষ্টি ২০ টাকা দরে বিক্রি করেন তিনি। দিনে গড়ে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার মিষ্টি বিক্রি হলেও, তা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে চলে সংসার।
মুসাব আলী জানান, সপ্তাহে পাঁচ দিন তিনি বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মিষ্টি বিক্রি করেন। তবে বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো হাঁটতে পারেন না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে আগের তুলনায় আয়ও কমে গেছে, যা তার সংসারে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, আগে আমি কৃষিকাজ করতাম, পাশাপাশি একটি মুদি দোকান ছিল। কিন্তু তেমন লাভ হচ্ছিল না। তখনই বাধ্য হয়ে এই পেশায় আসি। প্রায় ২১ বছর আগে এক চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে মিষ্টি বানানো শিখি। তারপর থেকেই এই কাজ করছি।
বর্তমানে তিনি ও তার স্ত্রী মিলে বাড়িতেই মিষ্টি তৈরি করেন। সাম্প্রতিক সময়ে চিনির দাম কিছুটা কমায় মুসাব আলীও মিষ্টির দাম কমিয়েছেন। আগে যেখানে প্রতি কেজি মিষ্টি ৩০০ টাকায় বিক্রি করতেন, এখন তা ২৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। এতে ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি মিললেও তার লাভের পরিমাণ কমে গেছে বলে জানান বৃদ্ধ মুসাব আলী।
স্থানীয় ক্রেতা আব্দুল করিম বলেন, মুসাব আলী চাচার মিষ্টি অনেক সুস্বাদু। আমরা ছোটবেলা থেকেই তার কাছ থেকে মিষ্টি কিনি। এত বয়সেও তিনি যেভাবে কষ্ট করে কাজ করছেন, সেটা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। আমরা চাই, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ তার পাশে দাঁড়াক।

আরেক ক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, এখনকার দিনে অনেক তরুণ কাজ না করে বসে থাকে, কিন্তু এই বয়সে একজন মানুষ যেভাবে পরিশ্রম করছেন, তা আমাদের লজ্জা দেয়। তার জন্য কোনো সহায়তা থাকলে ভালো হতো।
আকিমুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, বয়সের ভার ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন মুসাব আলী। তবুও জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে থেমে যাননি তিনি। প্রতিদিনের মতো এখনও কাঁধে বাঁকে মিষ্টি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন—এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে, শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর অদম্য প্রত্যয়ে।
এএইচ
জীবননগর অফিস 





















