০৫:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় ‘নো কার্ড নো ফুয়েল’ কার্যক্রমে ভোগান্তি, যাচাই ছাড়াই দেয়া হচ্ছে জ্বালানি তেল

Ada. Munna Telecom1

জ্বালানি তেলের সংকট ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে চুয়াডাঙ্গায় আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ‘নো কার্ড, নো ফুয়েল’ কার্যক্রম। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন—মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে। তেল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করলেও অধিকাংশ গ্রাহকের কাছেই দেখা যাচ্ছে না ফুয়েল কার্ড। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পাম্প কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদেরও কার্ড যাচাই করতে দেখা যাচ্ছে না।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল থেকে ফুয়েল কার্ড ছাড়া কোনো যানবাহনে পেট্রোল বা অকটেন সরবরাহ না করার কথা। কিন্তু সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, বাস্তবে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। জেলার ২২টি পেট্রলপাম্পেই প্রায় একই চিত্র—কার্ড ছাড়াই তেল সরবরাহ চলছে অবাধে।

প্রতিদিনের মতো শুক্রবারও বিভিন্ন পাম্পে ছিল দীর্ঘ লাইন। কেউ কেউ রাত ৩টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের অপেক্ষায় ছিলেন। আবার কৃষকরাও ডিজেল সংগ্রহে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। যদিও কৃষিকাজের স্বার্থে ডিজেল সরবরাহে কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, কালোবাজারি রোধ এবং অতিরিক্ত মজুত বন্ধ করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফুয়েল কার্ডে গ্রাহকের পূর্বে নেয়া তেলের পরিমাণ ও তারিখ উল্লেখ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কার্ড পেতে আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন কপি ও ছবি জমা দিতে হয়েছে। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এসব কার্ড বিতরণও করা হয়েছে।

তবে বাস্তব চিত্রে হতাশ কার্ডধারীরা। তাদের অভিযোগ, কষ্ট করে কার্ড সংগ্রহ করলেও এর কোনো কার্যকর ব্যবহার নেই। ফলে নিয়ম মেনে চলা ব্যক্তিরাই এখন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

মোটরসাইকেল চালক তানভির রহমান বলেন, “ভোরবেলা এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। দুই ঘণ্টা পর ৫০০ টাকার অকটেন পেয়েছি। কিন্তু পাম্পে কোথাও ফুয়েল কার্ড যাচাই করতে দেখিনি। প্রায় সবাই কার্ড ছাড়াই তেল নিচ্ছে।”

আরেক চালক রুহুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনেক কষ্ট করে ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখানে তার কোনো মূল্য নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ পরিচিত লোকজন ভেতর দিয়ে ঢুকে তেল নিয়ে যাচ্ছে।”

এদিকে, নিয়ম অনুযায়ী পাম্পে ট্যাগ অফিসার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো পাম্পেই তাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। এতে পুরো কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সকাল ৭টা থেকে তেল সরবরাহ শুরুর কথা থাকলেও অনেক পাম্পে আগের দিন সন্ধ্যা থেকেই মোটরসাইকেল রেখে সিরিয়াল তৈরি করা হচ্ছে, যা বিশৃঙ্খলা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিএম তারিক উজ জামান জানান, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জেলার সব পেট্রলপাম্পে কার্ডধারীদের তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষিকাজের জন্য ডিজেল সরবরাহে কিছুটা ছাড় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেলের অপচয়, অবৈধ বিক্রি ও মজুত বন্ধ করা সম্ভব হবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, প্রশাসনের নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ তদারকি ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া ‘নো কার্ড, নো ফুয়েল’ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

জীবননগরের পিংকি হ ত্যা মামলার আসামি নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার

চুয়াডাঙ্গায় ‘নো কার্ড নো ফুয়েল’ কার্যক্রমে ভোগান্তি, যাচাই ছাড়াই দেয়া হচ্ছে জ্বালানি তেল

প্রকাশের সময় : ১১:১২:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি তেলের সংকট ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে চুয়াডাঙ্গায় আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ‘নো কার্ড, নো ফুয়েল’ কার্যক্রম। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন—মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে। তেল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করলেও অধিকাংশ গ্রাহকের কাছেই দেখা যাচ্ছে না ফুয়েল কার্ড। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পাম্প কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদেরও কার্ড যাচাই করতে দেখা যাচ্ছে না।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল থেকে ফুয়েল কার্ড ছাড়া কোনো যানবাহনে পেট্রোল বা অকটেন সরবরাহ না করার কথা। কিন্তু সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, বাস্তবে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। জেলার ২২টি পেট্রলপাম্পেই প্রায় একই চিত্র—কার্ড ছাড়াই তেল সরবরাহ চলছে অবাধে।

প্রতিদিনের মতো শুক্রবারও বিভিন্ন পাম্পে ছিল দীর্ঘ লাইন। কেউ কেউ রাত ৩টা থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের অপেক্ষায় ছিলেন। আবার কৃষকরাও ডিজেল সংগ্রহে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। যদিও কৃষিকাজের স্বার্থে ডিজেল সরবরাহে কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, কালোবাজারি রোধ এবং অতিরিক্ত মজুত বন্ধ করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফুয়েল কার্ডে গ্রাহকের পূর্বে নেয়া তেলের পরিমাণ ও তারিখ উল্লেখ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কার্ড পেতে আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন কপি ও ছবি জমা দিতে হয়েছে। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এসব কার্ড বিতরণও করা হয়েছে।

তবে বাস্তব চিত্রে হতাশ কার্ডধারীরা। তাদের অভিযোগ, কষ্ট করে কার্ড সংগ্রহ করলেও এর কোনো কার্যকর ব্যবহার নেই। ফলে নিয়ম মেনে চলা ব্যক্তিরাই এখন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

মোটরসাইকেল চালক তানভির রহমান বলেন, “ভোরবেলা এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। দুই ঘণ্টা পর ৫০০ টাকার অকটেন পেয়েছি। কিন্তু পাম্পে কোথাও ফুয়েল কার্ড যাচাই করতে দেখিনি। প্রায় সবাই কার্ড ছাড়াই তেল নিচ্ছে।”

আরেক চালক রুহুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনেক কষ্ট করে ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখানে তার কোনো মূল্য নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ পরিচিত লোকজন ভেতর দিয়ে ঢুকে তেল নিয়ে যাচ্ছে।”

এদিকে, নিয়ম অনুযায়ী পাম্পে ট্যাগ অফিসার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো পাম্পেই তাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। এতে পুরো কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সকাল ৭টা থেকে তেল সরবরাহ শুরুর কথা থাকলেও অনেক পাম্পে আগের দিন সন্ধ্যা থেকেই মোটরসাইকেল রেখে সিরিয়াল তৈরি করা হচ্ছে, যা বিশৃঙ্খলা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিএম তারিক উজ জামান জানান, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জেলার সব পেট্রলপাম্পে কার্ডধারীদের তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষিকাজের জন্য ডিজেল সরবরাহে কিছুটা ছাড় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেলের অপচয়, অবৈধ বিক্রি ও মজুত বন্ধ করা সম্ভব হবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, প্রশাসনের নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ তদারকি ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া ‘নো কার্ড, নো ফুয়েল’ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।