০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চুয়াডাঙ্গায় ‘মাদক নির্মূল কমিটি’'র সদস্য জসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আটকের পর ২০ হাজার টাকা লেনদেন ও ৯৭ বোতল মাদক কম দেখিয়ে মামলা

মাদক নির্মূলের লক্ষ্যেই স্থানীয়ভাবে গঠন করা হয়েছিল ‘মাদক নির্মূল কমিটি’। কিন্তু সেই কমিটিরই সদস্যের বিরুদ্ধে এবার উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। মাদক আটকের পর তা আত্মসাৎ, আটকের ঘটনা গোপন রেখে অর্থ আদায় এবং জব্দ করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ কম দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর ও মামলা করার অভিযোগ উঠেছে। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন আকন্দবাড়িয়া গ্রামের একটি ঘটনাকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। ঘটনাটি নিয়ে রেডিও চুয়াডাঙ্গার অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী তথ্যও পাওয়া গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুরে। জানা গেছে, আকন্দবাড়িয়া স্কুল এলাকার একটি বাঁশবাগানের মধ্য দিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ (৩০)। অভিযোগ অনুযায়ী, তার মোটরসাইকেলে ছিল ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ। ওই সময় স্থানীয় ‘মাদক নির্মূল কমিটি’র কয়েকজন সদস্য মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করে তল্লাশি চালান। সেখানে জসিম, জুয়েল, রিপন ও রকিসসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তল্লাশির পর বিকাশের মোটরসাইকেল ও মাদকগুলো নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেন কমিটির সদস্যরা। এ সময় মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিকাশের কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করে জসিম। টাকা না দিলে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন বিকাশ। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে তিনি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

স্থানীয় ও মাদক নির্মুল কমিটির সদস্যের সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থলের একটি বাঁশবাগানে এ সময় কয়েকজন নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। মাদক বহনকারী বিকাশের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে তিনি মাদকের ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যান। পরে ওই মাদকের ব্যাগ ও মোটরসাইকেল দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্থানীয়দের সামনে ঘটনাস্থলেই মাদকের ব্যাগ খুলে তল্লাশি না করে সেটি অন্য একটি স্থানে নিয়ে গিয়ে তল্লাশি করা হয়।

ঘটনার পর বিষয়টি সামনে আসে বিকাশের দুলাভাই পার্শবর্তী মানিকপুর গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়াকে ফোন করার মধ্য দিয়ে। রাজা অভিযোগ করেন, জসিম তাকে ফোন করে বিকাশকে মাদকসহ আটকের কথা জানান এবং মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা পাঠান বলে দাবি করেন রাজা। এ লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ তার কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা দেওয়ার পরও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।

মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়ার দাবি, তার কাছ থেকে ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ নেওয়া হলেও মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে ওই টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্য জসিমের ব্যক্তিগত নম্বরে পাঠানো হলেও বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। বরং তার অভিযোগ, ১৩২ বোতলের মধ্যে ৯৭ বোতল আত্মসাৎ করে পুলিশকে মাত্র ৩৫ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দর্শনা থানায় মামলা করা হয়েছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে থাকা মাদকের পরিমাণ এবং পরে মামলায় দেখানো উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। যদি সত্যিই ১৩২ বোতল মাদক থাকে, তাহলে বাকি মাদকের কী হয়েছে—এ প্রশ্ন উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ।

এদিকে এ ঘটনায় ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনার সময় উপস্থিত মাদক নির্মূল কমিটির সদস্য জসিম, জুয়েলসহ অন্তত তিনজনের সঙ্গে কথা হয় রেডিও চুয়াডাঙ্গার প্রতিবেদকের। তবে তাদের বক্তব্যে ঘটনার বিভিন্ন বিষয়ে অসঙ্গতি ও পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে জসিম রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে একটি ব্যাগে নিষিদ্ধ ৩২ বোতল সিরাপ পান। তবে বিকাশ তাকে টাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। বরং তাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে তার বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছেন বলেও জানান।

জসিম আরও বলেন, রাজা মিয়া ও বিকাশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমাদের প্রতিরোধের কারণে মাদক ব্যবসা করতে না পেরে কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ঘটনার পর থেকে পরদিন পর্যন্ত তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে জসিম বলেন, মোবাইলে চার্জ ছিল না। টানা ৫-৬ ঘণ্টা হয়তো চার্জের কারণে মোবাইল বন্ধ থাকতে পারে। তবে টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা কেন মোবাইল বন্ধ ছিল—এ প্রশ্নের সুদত্তর তিনি দিতে পারেননি।

বিকাশের কাছ থেকে পাঠানো ২০ হাজার টাকার বিষয়ে জসিম বলেন, পরদিন ভোরে মোবাইল চালু করার পর ২০ হাজার টাকা পাঠানোর মেসেজ দেখতে পান। কার টাকা, কে পাঠিয়েছে—তা তিনি জানতেন না বলেও দাবি করেন। তবে তিনি ওই টাকা উত্তোলন করেছেন বলে স্বীকার করেন। তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে নিজেরও কিছু টাকা ছিল এবং সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকার কম অথবা বেশি উত্তোলন করেছেন বলে জানান তিনি। পরে জানতে পারেন, তাকে ফাঁসাতেই মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়া টাকা পাঠিয়েছেন—এমন দাবি করেন জসিম।

অভিযানে থাকা কমিটির আরেক সদস্য জুয়েল বলেন, ঘটনাস্থল থেকে বিকাশ স্কুলব্যাগে মাদক ও মোটরসাইকেল রেখে তিনি পালিয়ে যান। এরপর তারা মাদকের ব্যাগ ও মোটরসাইকেল ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে পাশের একটি স্থানে যান। সেখানেই তল্লাশি চালিয়ে ৩২ বোতল মাদক পাওয়া যায় এবং পরে সেগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তবে ঘটনাস্থলে স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিতে মাদকের ব্যাগ খুলে তল্লাশি না করে সেটি অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে জুয়েলও কোনো সুদত্তর দিতে পারেননি। ২০ হাজার টাকা লেনদেনের বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না বলেও জানান। জসিম আমাকে কিছুই জানাইনি।

অন্যদিকে কমিটির আরেক সদস্য আব্বাস বলেন, অভিযানের পরই একজনের মাধ্যমে বিকাশে টাকা পাঠানোর স্ক্রীনসট তিনি দেখেছেন বলে দাবি করেন। বিষয়টি জানার পর তিনি কমিটির সভাপতি মুন্নাফকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তবে সভাপতি মুন্নাফ উল্টো তাকে প্রশ্ন করেন এবং উত্তেজিত হয়ে ওঠেন বলে দাবি করেন আব্বাস। তিনি আরও বলেন, মানহানির ভয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, এই কমিটি থেকে পদত্যাগ করবেন।

মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়া মুঠোফোনে আরও অভিযোগ করেন, জসিম মাদক নির্মূল কমিটি’র নাম ব্যবহার করে মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। তার অভিযোগ, মাদক উদ্ধারের পর সেটি যথাযথভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পরিবর্তে নিজেদের মধ্যে রেখে দেওয়ার পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।

তিনি আরও বলেন, এই নিয়ে আমার নামে তিনটি মাদক মামলা হয়েছে। তবে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি মাদক ব্যবসা ছেড়ে দেব।

এ ঘটনায় মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি মুন্নাফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেছুর রহমান বলেন, আমার জানামতে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর আকন্দবাড়িয়া এলাকা থেকে ৩২ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্ত করেছে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যরা। ঘটনাস্থলে কোনো আসামি পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে যা তদন্ত চলছে।

তিনি আরও বলেন, টাকা লেনদেন এবং মাদক কমের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে গতকাল সোমবার রাতে জসিম থানায় এসে জানিয়েছেন, তার বিকাশ একাউন্টে কে বা কারা ২০ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। পরে যে নাম্বার থেকে টাকা এসেছে ওই নাম্বারে যোগাযোগ এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য একটি সাধারণ ডায়েরি করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

১০৬ পিস ইয়াবাসহ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

চুয়াডাঙ্গায় ‘মাদক নির্মূল কমিটি’'র সদস্য জসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আটকের পর ২০ হাজার টাকা লেনদেন ও ৯৭ বোতল মাদক কম দেখিয়ে মামলা

প্রকাশের সময় : ১২:৪৪:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাদক নির্মূলের লক্ষ্যেই স্থানীয়ভাবে গঠন করা হয়েছিল ‘মাদক নির্মূল কমিটি’। কিন্তু সেই কমিটিরই সদস্যের বিরুদ্ধে এবার উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। মাদক আটকের পর তা আত্মসাৎ, আটকের ঘটনা গোপন রেখে অর্থ আদায় এবং জব্দ করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ কম দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর ও মামলা করার অভিযোগ উঠেছে। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন আকন্দবাড়িয়া গ্রামের একটি ঘটনাকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। ঘটনাটি নিয়ে রেডিও চুয়াডাঙ্গার অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী তথ্যও পাওয়া গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুরে। জানা গেছে, আকন্দবাড়িয়া স্কুল এলাকার একটি বাঁশবাগানের মধ্য দিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ (৩০)। অভিযোগ অনুযায়ী, তার মোটরসাইকেলে ছিল ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ। ওই সময় স্থানীয় ‘মাদক নির্মূল কমিটি’র কয়েকজন সদস্য মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করে তল্লাশি চালান। সেখানে জসিম, জুয়েল, রিপন ও রকিসসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তল্লাশির পর বিকাশের মোটরসাইকেল ও মাদকগুলো নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেন কমিটির সদস্যরা। এ সময় মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিকাশের কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করে জসিম। টাকা না দিলে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন বিকাশ। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে তিনি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

স্থানীয় ও মাদক নির্মুল কমিটির সদস্যের সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থলের একটি বাঁশবাগানে এ সময় কয়েকজন নারী-পুরুষ উপস্থিত ছিলেন। মাদক বহনকারী বিকাশের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে তিনি মাদকের ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যান। পরে ওই মাদকের ব্যাগ ও মোটরসাইকেল দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, স্থানীয়দের সামনে ঘটনাস্থলেই মাদকের ব্যাগ খুলে তল্লাশি না করে সেটি অন্য একটি স্থানে নিয়ে গিয়ে তল্লাশি করা হয়।

ঘটনার পর বিষয়টি সামনে আসে বিকাশের দুলাভাই পার্শবর্তী মানিকপুর গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়াকে ফোন করার মধ্য দিয়ে। রাজা অভিযোগ করেন, জসিম তাকে ফোন করে বিকাশকে মাদকসহ আটকের কথা জানান এবং মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা পাঠান বলে দাবি করেন রাজা। এ লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ তার কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা দেওয়ার পরও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি।

মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়ার দাবি, তার কাছ থেকে ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ নেওয়া হলেও মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে ওই টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্য জসিমের ব্যক্তিগত নম্বরে পাঠানো হলেও বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। বরং তার অভিযোগ, ১৩২ বোতলের মধ্যে ৯৭ বোতল আত্মসাৎ করে পুলিশকে মাত্র ৩৫ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দর্শনা থানায় মামলা করা হয়েছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে থাকা মাদকের পরিমাণ এবং পরে মামলায় দেখানো উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। যদি সত্যিই ১৩২ বোতল মাদক থাকে, তাহলে বাকি মাদকের কী হয়েছে—এ প্রশ্ন উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ।

এদিকে এ ঘটনায় ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনার সময় উপস্থিত মাদক নির্মূল কমিটির সদস্য জসিম, জুয়েলসহ অন্তত তিনজনের সঙ্গে কথা হয় রেডিও চুয়াডাঙ্গার প্রতিবেদকের। তবে তাদের বক্তব্যে ঘটনার বিভিন্ন বিষয়ে অসঙ্গতি ও পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে জসিম রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে একটি ব্যাগে নিষিদ্ধ ৩২ বোতল সিরাপ পান। তবে বিকাশ তাকে টাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। বরং তাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে তার বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছেন বলেও জানান।

জসিম আরও বলেন, রাজা মিয়া ও বিকাশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমাদের প্রতিরোধের কারণে মাদক ব্যবসা করতে না পেরে কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ঘটনার পর থেকে পরদিন পর্যন্ত তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে জসিম বলেন, মোবাইলে চার্জ ছিল না। টানা ৫-৬ ঘণ্টা হয়তো চার্জের কারণে মোবাইল বন্ধ থাকতে পারে। তবে টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা কেন মোবাইল বন্ধ ছিল—এ প্রশ্নের সুদত্তর তিনি দিতে পারেননি।

বিকাশের কাছ থেকে পাঠানো ২০ হাজার টাকার বিষয়ে জসিম বলেন, পরদিন ভোরে মোবাইল চালু করার পর ২০ হাজার টাকা পাঠানোর মেসেজ দেখতে পান। কার টাকা, কে পাঠিয়েছে—তা তিনি জানতেন না বলেও দাবি করেন। তবে তিনি ওই টাকা উত্তোলন করেছেন বলে স্বীকার করেন। তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে নিজেরও কিছু টাকা ছিল এবং সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকার কম অথবা বেশি উত্তোলন করেছেন বলে জানান তিনি। পরে জানতে পারেন, তাকে ফাঁসাতেই মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়া টাকা পাঠিয়েছেন—এমন দাবি করেন জসিম।

অভিযানে থাকা কমিটির আরেক সদস্য জুয়েল বলেন, ঘটনাস্থল থেকে বিকাশ স্কুলব্যাগে মাদক ও মোটরসাইকেল রেখে তিনি পালিয়ে যান। এরপর তারা মাদকের ব্যাগ ও মোটরসাইকেল ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে পাশের একটি স্থানে যান। সেখানেই তল্লাশি চালিয়ে ৩২ বোতল মাদক পাওয়া যায় এবং পরে সেগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তবে ঘটনাস্থলে স্থানীয় মানুষের উপস্থিতিতে মাদকের ব্যাগ খুলে তল্লাশি না করে সেটি অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে জুয়েলও কোনো সুদত্তর দিতে পারেননি। ২০ হাজার টাকা লেনদেনের বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না বলেও জানান। জসিম আমাকে কিছুই জানাইনি।

অন্যদিকে কমিটির আরেক সদস্য আব্বাস বলেন, অভিযানের পরই একজনের মাধ্যমে বিকাশে টাকা পাঠানোর স্ক্রীনসট তিনি দেখেছেন বলে দাবি করেন। বিষয়টি জানার পর তিনি কমিটির সভাপতি মুন্নাফকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তবে সভাপতি মুন্নাফ উল্টো তাকে প্রশ্ন করেন এবং উত্তেজিত হয়ে ওঠেন বলে দাবি করেন আব্বাস। তিনি আরও বলেন, মানহানির ভয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, এই কমিটি থেকে পদত্যাগ করবেন।

মাদক ব্যবসায়ী রাজা মিয়া মুঠোফোনে আরও অভিযোগ করেন, জসিম মাদক নির্মূল কমিটি’র নাম ব্যবহার করে মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। তার অভিযোগ, মাদক উদ্ধারের পর সেটি যথাযথভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পরিবর্তে নিজেদের মধ্যে রেখে দেওয়ার পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।

তিনি আরও বলেন, এই নিয়ে আমার নামে তিনটি মাদক মামলা হয়েছে। তবে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি মাদক ব্যবসা ছেড়ে দেব।

এ ঘটনায় মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি মুন্নাফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেছুর রহমান বলেন, আমার জানামতে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর আকন্দবাড়িয়া এলাকা থেকে ৩২ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্ত করেছে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যরা। ঘটনাস্থলে কোনো আসামি পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে যা তদন্ত চলছে।

তিনি আরও বলেন, টাকা লেনদেন এবং মাদক কমের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে গতকাল সোমবার রাতে জসিম থানায় এসে জানিয়েছেন, তার বিকাশ একাউন্টে কে বা কারা ২০ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। পরে যে নাম্বার থেকে টাকা এসেছে ওই নাম্বারে যোগাযোগ এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য একটি সাধারণ ডায়েরি করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।