জীবনের শুরুতেই মাতৃস্নেহ হারানো, অভাবের সংসার আর প্রতিকূলতার দীর্ঘ পথ কোনো কিছুই সামিয়া আক্তারের শিক্ষার আলোয় এগিয়ে চলাকে থামাতে পারেনি। দিনমজুর বাবার সীমাহীন পরিশ্রম, সৎমায়ের নিঃস্বার্থ মমতা আর নিজের অদম্য অধ্যবসায়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের হুচুকপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের এই মেয়ের সাফল্যে আনন্দিত স্বজন, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।
সামিয়ার সাফল্যের গল্পের শিকড় ছড়িয়ে আছে বহু বছরের ত্যাগ আর ভালোবাসায়। মাত্র আট বছর বয়সে মা জোছনা আক্তার যুথিকে হারায় সে। ছোট্ট বয়সেই মায়ের স্নেহের ছায়া সরে গেলেও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার আলো নিভতে দেননি বাবা সাজেদুর রহমান। দিনমজুরের কাজ করে যা আয় করেছেন, তার মধ্য থেকেই মেয়ের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেও সামিয়ার শিক্ষাজীবন যেন থেমে না যায়, সেটিই ছিল তাঁর একমাত্র চেষ্টা।
পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই মেধার পরিচয় দিয়ে আসা সামিয়া এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে। এরপর অনেক কষ্টে তাকে চুয়াডাঙ্গার আদর্শ মহিলা কলেজে ভর্তি করান বাবা। সেই কলেজ থেকেই এবার এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। একের পর এক সাফল্য অর্জনের মধ্য দিয়ে বাবার দীর্ঘদিনের ত্যাগকে যেন সার্থকতার মুখ দেখিয়েছে সামিয়া।
মেয়ের এমন অর্জনে গর্বিত বাবা সাজেদুর রহমান বলেন, “আমার মেয়ের বয়স যখন আট বছর, তখন ওর মা মারা যায়। ছোটবেলা থেকেই সামিয়া খুব মেধাবী এবং পড়াশোনার প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর অনেক কষ্ট করে তাকে আদর্শ মহিলা কলেজে ভর্তি করাই। এবার এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়েছে। মেয়ের ইচ্ছাশক্তি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আমাকে সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছে।”
নিজের সীমিত সামর্থ্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি দিনমজুরের কাজ করি। অভাবের সংসার হলেও আমার স্বপ্ন, মেয়েকে একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব। দারিদ্র্য যেন তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই আমার চেষ্টা।”
সামিয়ার জীবনে মায়ের অভাব পূরণে বড় ভূমিকা রেখেছেন তার বর্তমান মা আঙ্গুরা খাতুন। নিজের গর্ভে সন্তান না নিয়েও সামিয়াকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন তিনি। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের মাতৃত্বের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের সেই মমতা ও ত্যাগের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, “আমার বর্তমান স্ত্রী আঙ্গুরা খাতুন সামিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের কোনো সন্তান নেননি। ছোটবেলা থেকেই নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখে মেয়েটিকে মানুষ করেছেন। একজন মায়ের যে স্নেহ-ভালোবাসা প্রয়োজন, তিনি তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সামিয়ার এই সাফল্যের পেছনে তারও অনেক অবদান রয়েছে।”
সৎমা হলেও সামিয়ার কাছে আঙ্গুরা খাতুনের পরিচয় মমতাময়ী মা হিসেবেই। আঙ্গুরা খাতুন বলেন, “সামিয়া আমার নিজের গর্ভের সন্তান না হলেও কখনো তাকে পর ভাবিনি। ছোট্ট মেয়েটিকে যখন কোলে তুলে নিয়েছি, তখন থেকেই নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসেছি। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মাতৃত্বের স্বপ্নও বিসর্জন দিয়েছি। অনেক কষ্ট করে ওকে বড় হতে দেখেছি। পড়াশোনার প্রতি ওর আগ্রহ দেখে সব সময় মনে হয়েছে, একদিন ও অনেক বড় হবে। আজ ওর ফলাফলে আমার বুকটা আনন্দে ভরে গেছে।”
প্রয়াত মায়ের জায়গা পূরণ করতে না পারলেও একজন মা হিসেবে সর্বোচ্চ স্নেহ ও যত্ন দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে জানান আঙ্গুরা খাতুন। তাঁর ভাষায়, “আমার একটাই চাওয়া, সামিয়া যেন আরও অনেক দূর এগিয়ে যায়, মানুষের মতো মানুষ হয়। ওর স্বপ্ন পূরণ হোক—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
অন্যদিকে, নিজের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগ ও সাহস জোগানোর কথা স্মরণ করেছে সামিয়া। সে জানায়, মায়ের মৃত্যুর পর বাবার আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে একসময় তার মনে হয়েছিল, হয়তো আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু বাবা ও বর্তমান মা কখনো তাকে ভেঙে পড়তে দেননি। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের সাহস ও অনুপ্রেরণা তাকে পড়াশোনায় মনোযোগী থাকতে সাহায্য করেছে।
সামিয়া বলে, “আজকের এই ফলাফল তাঁদের ত্যাগ ও ভালোবাসার ফল। এই সাফল্যের জন্য বাবা-মায়ের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। পাশাপাশি আদর্শ মহিলা কলেজের প্রভাষক রুবেল হোসেন ও রুমানা খাতুনসহ কলেজের সব শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। বিশেষ করে ঝোড়াঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রশিদ লাল্টু স্যার সব সময় বাবার মতো আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তাঁদের সবার সহযোগিতা ও ভালোবাসা আমার পথচলাকে সহজ করেছে।”
সামিয়ার সামনে এখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সে। একদিন নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোই তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
মাতৃহারা শৈশব, দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা আর জীবনের নানা সীমাবদ্ধতাকে জয় করে সামিয়ার এই অর্জন তাই কেবল পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন বাবার নিরলস সংগ্রাম, একজন মায়ের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং এক শিক্ষার্থীর হার না মানা স্বপ্নের গল্প।
এএইচ
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 












