১২:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভয়ংকর প্রতারণার জালে সৌদিতে আটকে আছে চুয়াডাঙ্গার চার যুবক, দিশেহারা পরিবার

সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের জিরাট এলাকার পাঁচটি পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন পরিণত হয়েছে চরম দুঃস্বপ্নে। ভালো কোম্পানিতে চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন এবং উন্নত জীবনযাপনের প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই গ্রামের মিনু খাতুন ও তার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত জাহিদ হাসান সবুজের বিরুদ্ধে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ তাদের কাছ থেকে মোট প্রায় ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা কাজের (ওয়ার্ক) ভিসায় সৌদি আরব পাঠানোর আশ্বাস দিলেও বাস্তবে চারজনকে টুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তাদের কোনো নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা না করে বিভিন্ন কফিলের (নিয়োগকর্তা) কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে তারা নিয়মিত বেতন, স্থায়ী কর্মসংস্থান এমনকি পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থাও না পেয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরে জরিমানার অজুহাতে তাদের পরিবারের কাছ থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থানরত ব্যক্তিরা বেতনবিহীন অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে দেশে থাকা তাদের পরিবার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যাংক, বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা বিদেশে আটকে থাকায় স্বজনদের ওপর নেমে এসেছে তীব্র অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকট।

সৌদি আরব থেকে পাঠানো ভিডিও বার্তায় ভুক্তভোগী রুবেল, আজানুরসহ তিনজন বলেন, আমাদের এখানে এনে বিভিন্ন কফিলের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো বেতন পাইনি। এক বেলা খেয়ে, না খেয়ে বেঁচে আছি। দেশে ফিরতেও পারছি না। বাধ্য হয়ে বাঁচার জন্য অন্যত্র চলে এসেছি।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণার শিকার হয়েছেন দর্শনা পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের জিরাট বাগানপাড়ার এজের আলীর ছেলে রুবেল (৩৫), আকবর আলীর ছেলে আজানুর (৪০), আয়ুব আলীর ছেলে আবু সাইদ ওরফে পিন্টু (৩৬), কাতব আলীর ছেলে সুরুজ (৪০) এবং সাদির ছেলে সজিব।

ভুক্তভোগী সজিব জানান, গ্রামের চারজনের দুরবস্থার কথা জানতে পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি বিদেশে যাননি। তবে বিদেশ পাঠানোর নামে আগেই তার কাছ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় গত ৫ জুলাই সজিব উদ্দীন দর্শনা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, প্রায় সাত মাস আগে মিনু খাতুন বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সজিবের কাছ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং অপর চারজনের পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে জনপ্রতি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা, পরে জরিমানা বাবদ আরও ৩০ হাজার টাকা করে এবং অন্যান্য খরচের নামে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে চারজনকে সৌদি আরব পাঠানো হলেও সেখানে তাদের জন্য কোনো বৈধ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, টুরিস্ট ভিসায় যাওয়ার কারণে তারা বর্তমানে আইনি জটিলতায় পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। টাকা ফেরত বা সমস্যার সমাধান চাইলে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মিনু খাতুন বলেন, আমার মাধ্যমে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন হয়নি। তাদের সঙ্গে সব ধরনের টাকা-পয়সার লেনদেন হয়েছে দামুড়হুদার ব্র্যাক স্কুলপাড়ার আবু বক্কর মাস্টারের ছেলে জাহিদ হাসান সবুজের মাধ্যমে। সবুজই এজেন্ট। আমি কোনো টাকা পাইনি। উল্টো আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এ কারণে আমিও আদালতে মামলা করেছি। এছাড়া আমার দুই ছেলেও বিদেশে রয়েছে, তাদের কোনো সমস্যা হয়নি।

অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে জাহিদ হাসান সবুজ বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে বৈধ রিক্রুটিং লাইসেন্স রয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে বসানো হয়েছিল। তবে সমঝোতা না হওয়ায় তাদের আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

জীবননগর প্রেসক্লাবের সভাপতি-সম্পাদকসহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে অপপ্রচার, থানায় জিডি

ভয়ংকর প্রতারণার জালে সৌদিতে আটকে আছে চুয়াডাঙ্গার চার যুবক, দিশেহারা পরিবার

প্রকাশের সময় : ১২:১৪:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের জিরাট এলাকার পাঁচটি পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন পরিণত হয়েছে চরম দুঃস্বপ্নে। ভালো কোম্পানিতে চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন এবং উন্নত জীবনযাপনের প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই গ্রামের মিনু খাতুন ও তার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত জাহিদ হাসান সবুজের বিরুদ্ধে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ তাদের কাছ থেকে মোট প্রায় ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা কাজের (ওয়ার্ক) ভিসায় সৌদি আরব পাঠানোর আশ্বাস দিলেও বাস্তবে চারজনকে টুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তাদের কোনো নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা না করে বিভিন্ন কফিলের (নিয়োগকর্তা) কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে তারা নিয়মিত বেতন, স্থায়ী কর্মসংস্থান এমনকি পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থাও না পেয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরে জরিমানার অজুহাতে তাদের পরিবারের কাছ থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থানরত ব্যক্তিরা বেতনবিহীন অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে দেশে থাকা তাদের পরিবার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যাংক, বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা বিদেশে আটকে থাকায় স্বজনদের ওপর নেমে এসেছে তীব্র অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকট।

সৌদি আরব থেকে পাঠানো ভিডিও বার্তায় ভুক্তভোগী রুবেল, আজানুরসহ তিনজন বলেন, আমাদের এখানে এনে বিভিন্ন কফিলের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো বেতন পাইনি। এক বেলা খেয়ে, না খেয়ে বেঁচে আছি। দেশে ফিরতেও পারছি না। বাধ্য হয়ে বাঁচার জন্য অন্যত্র চলে এসেছি।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতারণার শিকার হয়েছেন দর্শনা পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের জিরাট বাগানপাড়ার এজের আলীর ছেলে রুবেল (৩৫), আকবর আলীর ছেলে আজানুর (৪০), আয়ুব আলীর ছেলে আবু সাইদ ওরফে পিন্টু (৩৬), কাতব আলীর ছেলে সুরুজ (৪০) এবং সাদির ছেলে সজিব।

ভুক্তভোগী সজিব জানান, গ্রামের চারজনের দুরবস্থার কথা জানতে পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি বিদেশে যাননি। তবে বিদেশ পাঠানোর নামে আগেই তার কাছ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় গত ৫ জুলাই সজিব উদ্দীন দর্শনা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, প্রায় সাত মাস আগে মিনু খাতুন বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সজিবের কাছ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং অপর চারজনের পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে জনপ্রতি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা, পরে জরিমানা বাবদ আরও ৩০ হাজার টাকা করে এবং অন্যান্য খরচের নামে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে চারজনকে সৌদি আরব পাঠানো হলেও সেখানে তাদের জন্য কোনো বৈধ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, টুরিস্ট ভিসায় যাওয়ার কারণে তারা বর্তমানে আইনি জটিলতায় পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। টাকা ফেরত বা সমস্যার সমাধান চাইলে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মিনু খাতুন বলেন, আমার মাধ্যমে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন হয়নি। তাদের সঙ্গে সব ধরনের টাকা-পয়সার লেনদেন হয়েছে দামুড়হুদার ব্র্যাক স্কুলপাড়ার আবু বক্কর মাস্টারের ছেলে জাহিদ হাসান সবুজের মাধ্যমে। সবুজই এজেন্ট। আমি কোনো টাকা পাইনি। উল্টো আমাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এ কারণে আমিও আদালতে মামলা করেছি। এছাড়া আমার দুই ছেলেও বিদেশে রয়েছে, তাদের কোনো সমস্যা হয়নি।

অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে জাহিদ হাসান সবুজ বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে বৈধ রিক্রুটিং লাইসেন্স রয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে বসানো হয়েছিল। তবে সমঝোতা না হওয়ায় তাদের আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।