চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় অবৈধভাবে সার পরিবহনের অভিযোগে আবারও বিপুল পরিমাণ সার জব্দ করেছে পুলিশ। রোববার (৮ নভেম্বর) সকালে উপজেলার নওদা হাঁপানিয়া গ্রামে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত লাটাহাম্বারে করে নিয়ে যাওয়ার সময় ৫০ বস্তা সার জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাসিন্দা হাসান নামে এক সার ক্রেতাকে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা সার ও আটক ব্যক্তিকে আলমডাঙ্গা থানায় নেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে একই উপজেলার ভাংবাড়ীয়া বাজারের মিনারুল স্টোরের মালিক মিনারুল ইসলামের সারের ব্যবসা ও পরিবহন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রাম থেকে অবৈধভাবে পাচারের সময় একটি ট্রাকে থাকা ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার জব্দ করেছিল পুলিশ। ওই সারগুলো মিনারুল ইসলামের ছিল। আজকের ওই চালানটিও মিনারুল ইসলাম বলে তিনি নিজে স্বীকার করেছেন।

রেডিও চুয়াডাঙ্গার অনুসন্ধানে জানা গেছে, জব্দ করা ৫০ বস্তা সার আলমডাঙ্গার ভাংবাড়ীয়া বাজারের মিনারুল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মনিরুল ইসলামের। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই সারের ব্যবসা করে আসছেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অনুমোদিত ডিলার নন বলেও জানিয়েছেন। বিভিন্ন স্থান থেকে সার কিনে কৃষকদের কাছে সামান্য লাভে বিক্রি করেন বলে দাবি তাঁর।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে নওদা হাঁপানিয়া এলাকায় লাটাহাম্বারে করে সার পরিবহনের সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। তাঁরা গাড়িটির গতিরোধ করে পুলিশকে খবর দেন। পরে হাঁপানিয়া পুলিশ ক্যাম্পের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) প্রবাস কুমার ঘটনাস্থলে পৌঁছে সারবোঝাই লাটাহাম্বার, চালক ও সার ক্রেতা হাসানকে আটক করেন। জব্দ করা ৫০ বস্তা সারের মধ্যে ডিএপি ২০ বস্তা, ইউরিয়া ২৫ বস্তা এবং টিএসসি ৫ বস্তা।
এএসআই প্রবাস কুমার রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, স্থানীয়রা প্রথমে গাড়িটি আটক করেছিলেন। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ৫০ বস্তা সারসহ লাটাহাম্বার ও চালককে আটক করেন। এ ছাড়া গাংনীর হাসান নামে এক ব্যক্তি ওই সার কিনেছেন বলে জানা গেছে। সারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আলমডাঙ্গা থানায় পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেখবেন।
এ বিষয়ে জানতে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসার মাসুদ হোসেন পলাশের নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে বিশেষ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মূল অভিযুক্ত মিনারুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা হবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তদন্ত চলছে; তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের নামে মামলা করা হবে।
এর আগেও জব্দ হয়েছিল ৪৪০ বস্তা সার
মিনারুল ইসলামের সারের ব্যবসা নিয়ে এর আগেও একই উপজেলায় বড় ধরনের অভিযান হয়েছিল। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রাম থেকে পাচারের সময় একটি ট্রাক থেকে ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার জব্দ করে পুলিশ। ওই সারও মনিরুল ইসলামের বলে জানা যায়। সে সময় ট্রাকচালক, হেলপারসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, যশোরের নওয়াপাড়ার ‘দিনান ট্রান্সপোর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাকটিতে করে সারগুলো চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে আনা হচ্ছিল। তবে সার পরিবহনের কাগজপত্র ও গন্তব্য নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে হাঁপানিয়া পুলিশ ক্যাম্পের সদস্যরা ট্রাকটি আটক করেন। পরে তল্লাশি করে ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার পাওয়া যায়।
ওই ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ট্রাকচালক শাকিল হোসেন, খুলনার ইসরাফিল এবং আলমডাঙ্গার ভাংবাড়িয়া গ্রামের মৃত আমজাদ আলীর ছেলে মিনারুল ইসলাম। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে সার পরিবহনের দায়ে সারের মালিক মিনারুল ইসলামকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

জব্দ করা সার নষ্ট না করে কৃষকদের চাহিদা পূরণে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অধিদপ্তর। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রথম দফায় ৯৫ বস্তা টিএসপি সার বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা সার কার্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত দামে ওই সার সংগ্রহ করেন।
লাইসেন্স নেই, বিসিআইসির ডিলারও নন—স্বীকার মুদি দোকানি মিনারুলের
রোববারের অভিযানে জব্দ হওয়া সার নিয়ে রেডিও চুয়াডাঙ্গার প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন মনিরুল স্টোরের মালিক মিনারুল ইসলাম। তিনি ৫০ বস্তা সার মেহেরপুরের গাংনীর হাসানের কাছে বিক্রির কথা স্বীকার করেন। মিনারুল বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি সারের ব্যবসা করছেন। তিনি বিসিআইসির কোনো ডিলার নন এবং তাঁর কোনো লাইসেন্সও নেই। বিভিন্ন স্থান থেকে সার কিনে সামান্য লাভে কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন।
লাইসেন্স না থাকায় তাঁর ব্যবসা অবৈধ কি না—এমন প্রশ্নে মিনারুল বলেন, যেহেতু তাঁর কোনো লাইসেন্স নেই, তাই এটিকে অবৈধ বলতেই হবে। গত সেপ্টেম্বরে ৪৪০ বস্তা সার জব্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় তাঁর অনেক টাকার ক্ষতি হয়েছে। অবৈধ জানার পরও কেন বারবার এ ধরনের ব্যবসা করছেন, সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। এ সময় সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য প্রতিবেদককে অনুরোধও করেন মিনারুল ইসলাম।
প্রায় ৩০ বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়া সার ব্যবসার কথা দোকানির নিজের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসার পাশাপাশি গত সেপ্টেম্বর ও চলতি নভেম্বরের দুটি ঘটনায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের সারের চালান জব্দের তথ্য সামনে এসেছে। আগের ঘটনায় জরিমানা হলেও নতুন করে একই প্রতিষ্ঠানের সার জব্দ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এবারও পার পেয়ে যাবে এই মিনারুল ইসলাম, প্রশ্ন স্থানীয় কৃষকদের।
এএইচ
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















