চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ওসমানপুর গ্রামে নিজের ব্রয়লার মুরগির খামার থেকে রাজাবুল ইসলাম (৩৫) নামে এক ব্যক্তি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে গভীর রাতে স্ত্রীকে মেসেঞ্জারে পাঠানো তাঁর একটি বার্তাকে ঘিরে ঘটনাটি আরও রহস্যজনক হয়ে উঠেছে। বার্তায় তিনি দ্রুত খামারে আসতে বলেন এবং আশপাশে কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে ও তাঁর ভয় লাগছে বলে জানান। অথচ সকালে পরিবারের সদস্যরা খামারে গিয়ে তাঁর মোবাইল ফোন ও পরনের জামাকাপড় পড়ে থাকতে দেখলেও রাজাবুলের কোনো সন্ধান পাননি। নিখোঁজের দুই দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এতে পরিবারে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয়দের মধ্যেও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
রাজাবুল ইসলাম হারদী ইউনিয়নের ওসমানপুর গ্রামের আয়নাল হকের ছেলে। বাড়ির পাশেই তাঁর একটি ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে। মুরগি পাহারা দেওয়ার জন্য প্রায়ই রাতে তিনি খামারে অবস্থান করতেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে তিনি খামারে যান। রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে নিজের স্ত্রীর মোবাইল ফোনের মেসেঞ্জারে তিনি দ্রুত তাঁকে খামারে আসতে বলেন। একই সঙ্গে আশপাশে কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে এবং তাঁর ভয় লাগছে বলেও বার্তা দেন।
এদিকে বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে রেডিও চুয়াডাঙ্গার প্রতিবেদককে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বানী ইসরাইল বলেন, আমরা রাজাবুল ইসলামের লোকেশন শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
কিন্তু গভীর রাতে স্ত্রী ঘুমিয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ওই বার্তা দেখতে পাননি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেসেঞ্জারের বার্তাটি দেখতে পান তিনি। এরপর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত খামারে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে রাজাবুলকে না পেলেও তাঁর মোবাইল ফোন ও পরনের জামাকাপড় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। খামার ও আশপাশের এলাকায় খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয়দের সহায়তায় বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান শুরু করেন। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
নিখোঁজ হওয়ার আগে আতঙ্কিত অবস্থায় স্ত্রীকে বার্তা পাঠানো, এরপর খামারে মোবাইল ফোন ও জামাকাপড় পড়ে থাকা এবং কোনো সন্ধান না পাওয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিছক স্বাভাবিক নিখোঁজের ঘটনা কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একজন ব্যক্তি যদি গভীর রাতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বার্তা পাঠান, তাহলে পরবর্তী সময়ে তাঁর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে রাজাবুলের নিখোঁজের ঘটনায় পারিবারিক বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তাঁর বাবা আয়নাল হক জানিয়েছেন, প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর প্রায় নয় মাস আগে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর থেকেই ছেলের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। একপর্যায়ে রাগ করে রাজাবুল বাড়ির পরিবর্তে মুরগির খামারে রাতযাপন শুরু করেন বলে দাবি তাঁর বাবার।
আয়নাল হকের দাবি, রাজাবুলের শ্বশুর-শাশুড়ি বর্তমানে ওসমানপুরে তাঁর ছেলের ভাড়া বাসায় থাকছেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা ছেলেকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছেন বলে তাঁর অভিযোগ। এসব বিষয় নিয়ে স্থানীয় মণ্ডল-মাতব্বরদের উপস্থিতিতে সালিশ হওয়ার কথা ছিল বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, রাজাবুলের শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং হুমকিও দেন।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং রাজাবুলের নিখোঁজের সঙ্গে এসব বিরোধের সরাসরি কোনো যোগসূত্রও এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। তাঁর বাবা আশঙ্কা করছেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে রাজাবুল হয়তো আত্মগোপনে থাকতে পারেন। আবার ঘটনাটির পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
তবে নিখোঁজের দুই দিন পরও তাঁর অবস্থান শনাক্ত না হওয়ায় পরিবারের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। একজন ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন, এরপর তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও জামাকাপড় ঘটনাস্থলে পড়ে রয়েছে—এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টিকে সাধারণ নিখোঁজ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। দ্রুত প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান, মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা নিবিড়ভাবে তল্লাশি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি উঠেছে।
রাজাবুলের পরিবারও প্রশাসনের কাছে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার এবং দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করার দাবি জানিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, সময় যত গড়াবে রাজাবুলের অবস্থান শনাক্ত ও তাঁকে নিরাপদে উদ্ধারের কাজ ততই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই কোনো সম্ভাবনাকেই বাদ না দিয়ে দ্রুত ও সমন্বিত অনুসন্ধান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন স্বজনরা।
রাজাবুল কোথায়, কী অবস্থায় আছেন—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে আছেন, নাকি তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে—তা তদন্তেই পরিষ্কার হবে। তবে তাঁর নিজের পাঠানো ‘ভয় লাগছে’ বার্তাটি উপেক্ষা না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাটির গভীরে পৌঁছানো এবং রাজাবুলকে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে জানান স্বজনরা।
এএইচ
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















