০৯:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিবন্ধী দুই ভাই-বোনের মানবেতর জীবন : একমুঠো খাবারের আশায় দিন কাটে তাদের

একসময় রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেন। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ১২ বছর আগে হারিয়ে ফেলেন কর্মক্ষমতা। এখন অন্যের সাহায্যের ওপরই নির্ভর তার জীবন। কেউ খাবার নিয়ে এলে জোটে, আর সাহায্যের হাত না বাড়ালে রাত-দিন না খেয়েই কাটাতে হয়। 

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের আগধল্ল্যা গ্রামের শফিকুল খলিফার দিনের বড় একটি সময় ঘরের দরজার পাশে বসে কাটে। চোখ থাকে আকাশের দিকে, যদি কেউ খাবার নিয়ে আসেন। শফিকুল খলিফা (৪৭) ওই গ্রামের মৃত রশিদ খলিফার ছেলে।

জানা যায়, বাবা রশিদ খলিফা মারা গেছেন প্রায় ২০ বছর আগে। মুদি দোকান চালিয়ে চার সন্তানকে নিয়ে ভালোই চলছিল তার সংসার। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শফিকুল। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এখন ৪৭ বছর বয়সী শফিকুল আর তার ৪০ বছর বয়সী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছোট বোন ফাতেমা আক্তারের সংসার চলে মানুষের সহায়তায়। বাবার রেখে যাওয়া মাত্র পাঁচ শতাংশ পরিত্যক্ত জমিতে ভাঙাচোরা দুই চালার একটি ঘর। আশপাশে নেই তেমন কোনো বাড়িঘর। নেই বিদ্যুৎ, রান্নাঘর, স্যানেটারি শৌচাগার। বর্ষা এলেই বাড়ির চারপাশ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে নিয়মিত খাবার সহায়তাও পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন খাবারের অপেক্ষায় দরজার পাশে বসে থাকা ছাড়া যেন আর কোনো উপায় থাকে না শফিকুলের। 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু পারেন সাহায্য করেন। কিন্তু তাদের চিকিৎসা, থাকার ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। সরকারসহ সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে তাদের জীবনটা একটু সহজ হতো।

স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল মিয়া বলেন, ১২ বছর যাবত শফিকুল খলিফা অসুস্থতা। অসুস্থতার আগে তিনি সংসারের হাল ধরেছিলেন। তার বাবা রশিদ খলিফা জীবিত থাকতে তাদের পরিবার সচ্ছল ছিল। তাদের বাবার মুদির দোকান ছিল। ২০ বছর আগে তাদের বাবা মারা যান। তারপর থেকে শফিকুল খলিফা সংসারের হাল ধরেন। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে এখন অসহায় জীবন-যাপন করছেন। 

তিনি আরও বলেন, তাদের পাশে আমরা তেমন দাঁড়াতে পারেনি। এলাকার মানুষ কিছু সহযোগিতা করে, যার ফলে কোনোরকম খেয়েপরে আছেন। আমরা সবাই  ঘর, টয়লেট ও রান্না ঘর নির্মাণ 

করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। যাতে করে তারা যেন দুইজন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন। আমরা এলাকাবাসী ও দেশবাসীকে তাদের পাশে থাকার আহ্বান জানাই। 

স্থানীয় বাসিন্দা ডি. কে রুবেল বলেন, ১২ বছর ধরে অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছে শফিকুল খলিফা। নেই টয়লেট, নেই রান্নাঘর। জরাজীর্ণ এক ঝোপঝাড়ের মধ্যে বসতঘর। এই জায়গায় না আসলে কেউ বলতে পারবে না, তারা কীভাবে দুই ভাই-বোন বেঁচে আছেন। কেউ খাবার দিলে খেতে পারেন। আমরা চাই মানুষ তাদের সহযোগিতা করুক। তারা যেন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন। অসুস্থ শফিকুল খলিফা চিকিৎসা নিতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা এলাকাবাসী টাকা উত্তোলন করতেছি তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য। এ ছাড়া ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ইউএনও তাদেরকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কাজী মহসীন বলেন, শফিকুলের বাবা আমার দুঃসম্পর্কের চাচা লাগতো। খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তার বাবা ব্যবসা করতেন, জমিও ছিল। ২০ বছর আগে তিনি মারা যান। পরে শফিকুল রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছিল। হঠাৎ করে অসুস্থ ও প্যারালাইসিস হয়ে ১২ বছর ধরে ঘরে পড়ে আছে। কোনো কাজ করতে পারে না।  

শফিকুল খলিফার বোন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ফাতেমা আক্তার বলেন, যখন বাবা ছিল তখন বাবা সংসার চালাইতেন। বাবার মৃত্যুর পর আমার এই ভাই সংসারের হাল ধরেন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ১২ বছর ধরে ঘরে পড়ে আছেন। এখন চলাচল করতে পারেন না। মানুষ যদি খেতে দেয় তাহলে খেতে পারি। কেউ যদি না দেয় তাহলে খেতে পারি না। সবাই যদি আমাদের সহযোগিতা করতেন তাহলে খেতে পারতাম। ভাইয়ের চিকিৎসা করাতে পারতাম।

অসুস্থ শফিকুল খলিফা বলেন, আমি ১২ বছর ধরে ঘরে পড়ে আছি। চলাফেরা করতে পারি না। আমার কি হয়ছে, টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারি না। কে আমাকে চিকিৎসা করবে? যখন ভালো ছিলাম তখন কাজ করে সংসারের হাল ধরেছি। 

জামুর্কী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য কাজী জোৎস্না বলেন, শফিকুল ও তার বোন খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের সহযোগিতা করা সবার দায়িত্ব। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও তাদের পাশে এগিয়ে আসা উচিত।

মির্জাপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, দুই ভাইবোনের এই করুন অবস্থা জানার পর দুজনকেই ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। আগামী মাস থেকেই তারা ভাতার টাকা পাবেন। তাদেরকে যতটুকু সহযোগিতা করা যায়, সেই জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

সুত্র – ঢাকা পোস্ট

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাজাপ্রাপ্ত কয়েদির মৃত্যু

প্রতিবন্ধী দুই ভাই-বোনের মানবেতর জীবন : একমুঠো খাবারের আশায় দিন কাটে তাদের

প্রকাশের সময় : ০২:৪৯:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেন। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ১২ বছর আগে হারিয়ে ফেলেন কর্মক্ষমতা। এখন অন্যের সাহায্যের ওপরই নির্ভর তার জীবন। কেউ খাবার নিয়ে এলে জোটে, আর সাহায্যের হাত না বাড়ালে রাত-দিন না খেয়েই কাটাতে হয়। 

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের আগধল্ল্যা গ্রামের শফিকুল খলিফার দিনের বড় একটি সময় ঘরের দরজার পাশে বসে কাটে। চোখ থাকে আকাশের দিকে, যদি কেউ খাবার নিয়ে আসেন। শফিকুল খলিফা (৪৭) ওই গ্রামের মৃত রশিদ খলিফার ছেলে।

জানা যায়, বাবা রশিদ খলিফা মারা গেছেন প্রায় ২০ বছর আগে। মুদি দোকান চালিয়ে চার সন্তানকে নিয়ে ভালোই চলছিল তার সংসার। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শফিকুল। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এখন ৪৭ বছর বয়সী শফিকুল আর তার ৪০ বছর বয়সী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছোট বোন ফাতেমা আক্তারের সংসার চলে মানুষের সহায়তায়। বাবার রেখে যাওয়া মাত্র পাঁচ শতাংশ পরিত্যক্ত জমিতে ভাঙাচোরা দুই চালার একটি ঘর। আশপাশে নেই তেমন কোনো বাড়িঘর। নেই বিদ্যুৎ, রান্নাঘর, স্যানেটারি শৌচাগার। বর্ষা এলেই বাড়ির চারপাশ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে নিয়মিত খাবার সহায়তাও পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন খাবারের অপেক্ষায় দরজার পাশে বসে থাকা ছাড়া যেন আর কোনো উপায় থাকে না শফিকুলের। 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু পারেন সাহায্য করেন। কিন্তু তাদের চিকিৎসা, থাকার ব্যবস্থা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। সরকারসহ সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে তাদের জীবনটা একটু সহজ হতো।

স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল মিয়া বলেন, ১২ বছর যাবত শফিকুল খলিফা অসুস্থতা। অসুস্থতার আগে তিনি সংসারের হাল ধরেছিলেন। তার বাবা রশিদ খলিফা জীবিত থাকতে তাদের পরিবার সচ্ছল ছিল। তাদের বাবার মুদির দোকান ছিল। ২০ বছর আগে তাদের বাবা মারা যান। তারপর থেকে শফিকুল খলিফা সংসারের হাল ধরেন। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে এখন অসহায় জীবন-যাপন করছেন। 

তিনি আরও বলেন, তাদের পাশে আমরা তেমন দাঁড়াতে পারেনি। এলাকার মানুষ কিছু সহযোগিতা করে, যার ফলে কোনোরকম খেয়েপরে আছেন। আমরা সবাই  ঘর, টয়লেট ও রান্না ঘর নির্মাণ 

করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। যাতে করে তারা যেন দুইজন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন। আমরা এলাকাবাসী ও দেশবাসীকে তাদের পাশে থাকার আহ্বান জানাই। 

স্থানীয় বাসিন্দা ডি. কে রুবেল বলেন, ১২ বছর ধরে অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছে শফিকুল খলিফা। নেই টয়লেট, নেই রান্নাঘর। জরাজীর্ণ এক ঝোপঝাড়ের মধ্যে বসতঘর। এই জায়গায় না আসলে কেউ বলতে পারবে না, তারা কীভাবে দুই ভাই-বোন বেঁচে আছেন। কেউ খাবার দিলে খেতে পারেন। আমরা চাই মানুষ তাদের সহযোগিতা করুক। তারা যেন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন। অসুস্থ শফিকুল খলিফা চিকিৎসা নিতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা এলাকাবাসী টাকা উত্তোলন করতেছি তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য। এ ছাড়া ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও ইউএনও তাদেরকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা কাজী মহসীন বলেন, শফিকুলের বাবা আমার দুঃসম্পর্কের চাচা লাগতো। খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। তার বাবা ব্যবসা করতেন, জমিও ছিল। ২০ বছর আগে তিনি মারা যান। পরে শফিকুল রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছিল। হঠাৎ করে অসুস্থ ও প্যারালাইসিস হয়ে ১২ বছর ধরে ঘরে পড়ে আছে। কোনো কাজ করতে পারে না।  

শফিকুল খলিফার বোন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ফাতেমা আক্তার বলেন, যখন বাবা ছিল তখন বাবা সংসার চালাইতেন। বাবার মৃত্যুর পর আমার এই ভাই সংসারের হাল ধরেন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ১২ বছর ধরে ঘরে পড়ে আছেন। এখন চলাচল করতে পারেন না। মানুষ যদি খেতে দেয় তাহলে খেতে পারি। কেউ যদি না দেয় তাহলে খেতে পারি না। সবাই যদি আমাদের সহযোগিতা করতেন তাহলে খেতে পারতাম। ভাইয়ের চিকিৎসা করাতে পারতাম।

অসুস্থ শফিকুল খলিফা বলেন, আমি ১২ বছর ধরে ঘরে পড়ে আছি। চলাফেরা করতে পারি না। আমার কি হয়ছে, টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে পারি না। কে আমাকে চিকিৎসা করবে? যখন ভালো ছিলাম তখন কাজ করে সংসারের হাল ধরেছি। 

জামুর্কী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য কাজী জোৎস্না বলেন, শফিকুল ও তার বোন খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের সহযোগিতা করা সবার দায়িত্ব। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও তাদের পাশে এগিয়ে আসা উচিত।

মির্জাপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, দুই ভাইবোনের এই করুন অবস্থা জানার পর দুজনকেই ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। আগামী মাস থেকেই তারা ভাতার টাকা পাবেন। তাদেরকে যতটুকু সহযোগিতা করা যায়, সেই জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

সুত্র – ঢাকা পোস্ট