ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের আয়োজিত আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্ঠানের ব্যানারে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি না থাকা, উপস্থাপনায় সাংস্কৃতিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তির উপস্থিতি এবং জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহারের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে আপত্তি তুলেছে জেলা বিএনপি। এসব কারণে অনুষ্ঠান বর্জনের পাশাপাশি প্রতিবাদ জানান দলটির নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্যানারে জিয়াউর রহমানের ছবি না থাকার বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক।
এদিকে, অনুষ্ঠানে তাঁর দেওয়া ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন ডিসি সাহিত্য মঞ্চে এ ঘটনা ঘটে। আলোচনা সভা চলাকালে জেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা মঞ্চে উপস্থিত হয়ে অনুষ্ঠানের ব্যানারে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি না রাখার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় সাংস্কৃতিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তাঁরা। এ সময় অনুষ্ঠানস্থলে কিছুক্ষণের জন্য উত্তেজনা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। পরে এসব আপত্তির কথা জানিয়ে অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন বিএনপি নেতারা।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা বিএনপির নেতা শফিকুল ইসলাম পিটু। তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের ব্যানারে তাঁর ছবি রাখা হয়নি। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং অত্যন্ত নিন্দনীয়।
অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। শফিকুল ইসলাম পিটুর অভিযোগ, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে সাংস্কৃতিক লীগের একজন নেতাকে দিয়ে উপস্থাপনা করানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতাকর্মীদের এ ধরনের অনুষ্ঠানের মঞ্চে থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে অবহেলা করা হয়েছে, যা তাঁরা মেনে নিতে পারেন না।
জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ করে শফিকুল ইসলাম পিটু আরও বলেন, কারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কারা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী, তা প্রশাসনকে চিহ্নিত করতে হবে। সে অনুযায়ী অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো অনুষ্ঠানে ফ্যাসিবাদী হিসেবে অভিহিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকলে তাঁরা সেই অনুষ্ঠান হতে দেবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এ ছাড়া জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে নির্ধারিত আলোচনা সভার সময়েই জেলা প্রশাসনের একই ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনসহ আরও কিছু অসংগতির কথা উল্লেখ করে নেতারা অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্তের কথা জানান।
এদিকে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার ব্যানারে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ব্যানারে জিয়াউর রহমানের ছবি থাকা উচিত ছিল। এ জন্য তাঁরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ব্যানারে ছবি ব্যবহার না করার বিষয়ে সব সময় নির্দেশনা দেওয়া হয়—এ কারণে তাঁরা সব ধরনের ছবি বাদ রেখেছিলেন। তবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি ব্যানারে থাকলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং যথাযথভাবে খেয়াল রাখা উচিত ছিল বলেও স্বীকার করেন জেলা প্রশাসক।
ব্যানার ও উপস্থাপনা নিয়ে আপত্তির পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়। ৪৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ক্লিপটি ‘বিএনপি নেটওয়ার্ক-চুয়াডাঙ্গা-২’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশ করা হয়। এতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বক্তব্য দিতে শোনা যায় জেলা প্রশাসককে।
ভিডিওতে লুৎফুন নাহারকে বলতে শোনা যায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর কয়েক মাস দেশ অভিভাবকহীন ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। ওই বছরের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ মেজর জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো অভিভাবক ছিল না এবং দেশ বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। এ পরিস্থিতিতে দেশপ্রেমিক মানুষ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের এই অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সচেতন মহলে পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা সভায় ১৫ আগস্ট ও পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার ক্ষেত্রে বক্তব্যের উপস্থাপন ও মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং ওই সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ব্যাখ্যার ধরন নিয়ে তাঁরা আপত্তি জানিয়েছেন।
সুত্র : দৈনিক মাথাভাঙ্গা
এএইচ
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 


















