দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নতুন আশায় আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (হারদি হাসপাতাল) অপারেশন থিয়েটার (ওটি) চালু হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে নিয়মিত অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। গত ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ওটি চালুর পর তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত মাত্র ছয়টি অপারেশন হয়েছে। গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের সংকটের পাশাপাশি এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঘাটতি রয়েছে।
এর সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, টয়লেট ও ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা নিয়েও রোগী ও স্বজনদের অসন্তোষ রয়েছে। ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর থাকলেও সরকারি জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন পর ওটি চালু হওয়াকে ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
গত ৩ জুন ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওটি উদ্বোধন করেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। কিন্তু উদ্বোধনের পর তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অস্ত্রোপচারের সংখ্যা ছয়টির বেশি হয়নি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত অপারেশন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক না থাকায় ওটি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঘাটতিও রয়েছে। ফলে ওটি চালু হলেও এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম থেকে স্থানীয় রোগীরা প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না। হাসপাতালের অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে নানা সমস্যা।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে পানি সরবরাহ, টয়লেট এবং ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের কথা জানা গেছে। তাদের মতে, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতালের মৌলিক পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে জেনারেটর থাকলেও উপজেলা শহরের জন্য সরকারিভাবে জ্বালানি তেলের বরাদ্দ নেই। ফলে বিদ্যুৎ সমস্যার সময় জেনারেটর ব্যবহারেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয় বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজস্ব উদ্যোগে সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ চলছে। এটি চালু হলে বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছে।
হাসপাতালের টিকিটের মূল্য নির্ধারিত রয়েছে ৭ টাকা। তবে রোগীদের অভিযোগ, খুচরা টাকা না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ১০ টাকা নেওয়া হলেও অতিরিক্ত ৩ টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। এতে নির্ধারিত টিকিট মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী অভিযোগ করে বলেন, টিকিটের মূল্য ৭ টাকা হলেও ৩ টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। ৭ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা নির্ধারণ করে সরকারি ফান্ডে নেওয়া হলে বিষয়টি পরিষ্কার থাকত। অন্যথায় টিকিটের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী টাকা নেওয়া উচিত।
জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে জনবল সংকটের কারণে সেবার মান বিঘ্নিত হচ্ছে। গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক না থাকায় ওটি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট রয়েছে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রসঙ্গে তিনি জানান, কাগজে-কলমে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকলেও হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আরও তিনজনকে রাখা হয়েছে এবং তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে।
জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের বিষয়ে ডা. শারমিন আক্তার বলেন, উপজেলা শহরের জন্য সরকারিভাবে জ্বালানি তেলের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে নিজস্ব অর্থায়নে সোলার প্যানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি চালু হলে কিছুটা সুফল পাওয়া যাবে।
টিকিটের টাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোগীদের খুচরা টাকা নিয়ে আসতে বলা হচ্ছে। হাসপাতালের পক্ষ থেকে সবার টাকা খুচরা করে দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে তার বক্তব্য নেওয়ার আগে তথ্য সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শারমিন আক্তার বলেন, আমি তথ্য দিতে বাধ্য নই। আমি তথ্য দেব একমাত্র কর্তৃপক্ষকে। তথ্য চেয়ে আবেদন করার কথা বলা হলে তিনি জানান, মন্ত্রণালয় বা সিভিল সার্জন তথ্য দিতে বললে তিনি দেবেন। এর বাইরে নয়। প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার কথাও বলেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ওটি চালু হওয়ায় আলমডাঙ্গার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। তাদের দাবি, দ্রুত গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক, এক্স-রে টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিতে হবে।
একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট দূর করার পাশাপাশি পানি সরবরাহ, টয়লেট ও ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিদ্যুৎ সমস্যার সময় হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে জেনারেটরের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ নিশ্চিত করারও দাবি রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন পর চালু হওয়া অপারেশন থিয়েটারটি নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখা গেলে আলমডাঙ্গার মানুষকে অস্ত্রোপচারের জন্য অন্যত্র ছুটতে হবে না। একই সঙ্গে হাসপাতালের পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নতি করা গেলে ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে।
এএইচ
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 





















