একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে ৩৫ বছর বয়সী হাসানুজ্জামান রুবেলের জীবন। যে মানুষটি একসময় নিজের উপার্জনে স্ত্রী-সন্তানের খরচ চালাতেন, স্বপ্ন দেখতেন পাঁচ বছরের ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করে তার সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার— আজ সেই রুবেলই জীবনের কঠিন বাস্তবতায় অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। প্রায় আট মাস ধরে চিকিৎসার পেছনে পরিবারের সর্বস্ব ব্যয় করেও শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাননি তিনি। বরং একের পর এক জটিলতায় এখন প্রতিটি দিন তার কাছে হয়ে উঠেছে অসহনীয়।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ গোরস্থান পাড়ার একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী তানিয়া সুলতানা ও পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন হাসানুজ্জামান রুবেল। তাদের গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নতিডাঙ্গা গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই শহরের দক্ষিণ গোরস্থান পাড়ায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছেন তিনি।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন রুবেল। নিজের উপার্জনেই চলতো তার সংসার। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করবেন, তাকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বরের একটি সড়ক দুর্ঘটনা তার সেই স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে।
সেদিন বিকেলে যশোর থেকে কোম্পানির টাকা সংগ্রহ করে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন রুবেল। মোবারকগঞ্জ চিনিকলের সামনে পৌঁছালে একটি ট্রাকের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন তার চাচাতো ভাই ৩৫ বছর বয়সী আরিফ হোসেন। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যান রুবেল। দুর্ঘটনার পর তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৬ থেকে ১৭ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা চালিয়ে যান তিনি। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতে চিকিৎসার দীর্ঘ লড়াইয়ে পরিবারের যা কিছু সঞ্চয় ও সহায়-সম্বল ছিল, তার প্রায় সবই শেষ হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর ঘাড়ের নার্ভ ছিঁড়ে যাওয়ায় তার একটি হাত প্রায় পুরোপুরি প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে PLID (Prolapsed Lumbar Intervertebral Disc)। ফলে কোমর ও মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা, স্নায়ুতে চাপ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে। দিন-রাত প্রায় একই যন্ত্রণার মধ্যে কাটছে তার। কখনো ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে কাতরাতে কাতরাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এরই মধ্যে রুবেলের হার্টে পাঁচটি ব্লকও ধরা পড়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দিল্লি অথবা থাইল্যান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। দ্রুত চিকিৎসা না করাতে পারলে তার হাতটির কার্যকারিতা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
কিন্তু চিকিৎসার এই বিশাল ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই রুবেলের পরিবারের। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ৮-৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এমনকি নিজেদের মোটরসাইকেলটিও বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হয়েছে। এখন বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য আরও প্রয়োজন প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা। অথচ পরিবারের হাতে এই মুহূর্তে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংসারের নিত্যদিনের ব্যয়। অসুস্থ হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়া রুবেলের পরিবারকে একদিকে ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে ভাড়া বাসার খরচ ও খাবারের ব্যয় সামলাতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি দিনই তাদের জন্য হয়ে উঠেছে নতুন এক সংগ্রাম।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বাস্তবতা হলো— যে বয়সে পাঁচ বছরের শিশুটির বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই বাবার অসুস্থতার সঙ্গী হতে হচ্ছে তাকে। দুর্ঘটনার আগে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রুবেল। সন্তানকে ঘিরে ছিল তার অনেক স্বপ্ন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর সেই স্বপ্নগুলোও যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
রুবেলের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, আমাদের যা কিছু ছিল, সবকিছু দিয়েই এতদিন ওর চিকিৎসা চালিয়ে গেছি। এখন আমাদের হাতে আর কিছুই নেই। চিকিৎসার খরচ তো দূরের কথা, সংসার চালিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের ছোট ছেলেটাকে স্কুলে ভর্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওর বাবারও অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর সবকিছু থেমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী প্রতিদিন প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছেন। একজন স্ত্রী হিসেবে তার এই কষ্ট আর অসহায়ত্ব দেখে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষ যদি আমাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো আমার স্বামী আবার সুস্থ জীবনে ফিরতে পারবেন। এখন পর্যন্ত ৮-৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। নিজেদের মোটরসাইকেলটাও বিক্রি করে চিকিৎসা করতে হয়েছে। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য দিল্লি অথবা থাইল্যান্ড যেতে বলেছেন চিকিৎসক। সেখানে আরও ৭-৮ লাখ টাকা প্রয়োজন। এই মুহূর্তে আমাদের কোনো অর্থ নেই।
অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও ছেলেকে ঘিরেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন রুবেল। কখনো কখনো তার কষ্ট এতটাই বেড়ে যায় যে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিজের অসহায় অবস্থার কথা জানাতে তিনি কখনো ফেসবুক লাইভেও এসেছেন।
রুবেল বলেন, আমি আর এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। প্রতিদিন মনে হয় শরীরের ভেতরটা কেউ যেন ছিঁড়ে ফেলছে। আমার হাতটা ঠিকমতো কাজ করে না, সারাক্ষণ ব্যথা থাকে। ডাক্তার বলেছে খুব দ্রুত চিকিৎসা না করাতে পারলে চিরতরে হাতটা কার্যকারিতা হারাবে।
নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে চিকিৎসা করাতে গিয়েই আমার যা কিছু ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। এখন বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সেই টাকা আমি ও আমার পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। আমি মরতে চাই না, আমি বাঁচতে চাই। আমার ছোট ছেলেটার জন্য বাঁচতে চাই।
রুবেলের জীবনে তাঁর পাঁচ বছরের সন্তান এখন সবচেয়ে বড় প্রেরণা। বাবার কষ্ট বুঝতে না পারলেও শিশুটি বাবাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করে। রুবেল বলেন, ও আমাকে বলে, ‘বাবা, আমি তো আছি, তোমার কিছু হবে না।’ ওর এই কথাটা শুনলে মনে হয়, আমাকে বাঁচতেই হবে। আমি আবার ছেলের হাত ধরে হাঁটতে চাই, তাকে স্কুলে নিয়ে যেতে চাই।
হাসানুজ্জামান রুবেলের এই অসহায় পরিস্থিতিতে তার পরিবার সমাজের বিত্তবান, সামর্থ্যবান ব্যক্তি, প্রবাসী, সামাজিক সংগঠন এবং মানবিক মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছে। একই সঙ্গে তার উন্নত চিকিৎসার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও কামনা করেছে পরিবার।
রুবেলের চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে পারেন এই নম্বরে-
বিকাশ/নগদ : ০১৮১১-১৯২০৪৪
ব্যাংক হিসাব : ২৫১১০৫০৬৬২০৮২
ব্যাংক : ডাচ্-বাংলা ব্যাংক
অ্যাকাউন্টের নাম : হাসানুজ্জামান রুবেল
শাখা : চুয়াডাঙ্গা
SWIFT Code: DBBLBDDH
বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকে হাসানুজ্জামান রুবেলের চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অনেকে সহযোগিতার জন্য যোগাযোগের তথ্যও জানতে চেয়েছেন।হাসানুজ্জামান রুবেলের চিকিৎসার জন্য অর্থ সহায়তা সংগ্রহ বা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে রেডিও চুয়াডাঙ্গা কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। যারা সহযোগিতা করতে চান, তারা নিজ দায়িত্বে পরিবারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করে তারপর সহায়তা করার অনুরোধ করা হচ্ছে।আপনার সামান্য সহযোগিতাও হাসানুজ্জামান রুবেল ও তাঁর পরিবারের জন্য হয়ে উঠতে পারে বড় একটি আশার আলো।
এএইচ
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















