০৫:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্ত্রী-সন্তানসহ ছয় স্বজনকে কক্সবাজার রেখে চুয়াডাঙ্গায় ফিরেছিলেন নুর আলম, আগুনে নিভল সবার প্রাণ

  • আফজালুল হক
  • প্রকাশের সময় : ০৫:২৭:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫২৮ Views

কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ছয়জন সদস্যকে হারিয়েছেন চাকরির সুবাদে চুয়াডাঙ্গায় বসবাসরত নুর আলম। একসঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির ও সাত বছরের সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ফারিহার তিন বোন ও এক ভাই। কিন্তু সেই ভ্রমণই পরিবারের জন্য হয়ে উঠল এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। আগুনে স্ত্রী-সন্তানসহ ছয়জনের মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নুর আলম।

নুর আলম বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা। চাকরির সুবাদে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে টানা ৮ বছর বসবাস করে আসছেন। ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চুয়াডাঙ্গা মেডিকেল প্রমোশন অফিসার (এমপিও) হিসেবে কর্মরত নুর আলমের সংসারজুড়ে ছিল স্ত্রী-সন্তানকে ঘিরে স্বপ্ন ও ভালোবাসা। সেই সংসারেই এখন নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

মুঠোফোনে রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে নুর আলম জানান, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তিনি, তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির, সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ, তিন শ্যালিকা ও এক শ্যালক কক্সবাজারে বেড়াতে যান। তবে অফিসের কাজ থাকায় শুক্রবার তিনি তাঁদের সেখানে রেখে কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। আজ শনিবার সকালে ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঢাকায় ছুটে যান তিনি।

নুর আলম বলেন, আজ শনিবার কক্সবাজার থেকে তাদের ফিরে আসার কথা ছিল। কীভাবে রিসোর্টে আগুন লাগল, জানি না। সেখানে আটকা পড়ে আমার স্ত্রী, সন্তানসহ ছয়জন মারা গেছে। এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না, যে স্ত্রী-সন্তানকে কয়েক দিন আগে বেড়াতে পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের আর কখনো ফিরে পাওয়া হবে না।

নুর আলম আরও জানান, তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির অসুস্থ ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে তাঁকে অন্যের সাহায্য নিতে হতো। এ কারণে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন, যাতে তাঁর দেখাশোনায় সুবিধা হয়। কিন্তু সেই একসঙ্গে যাওয়াই শেষ পর্যন্ত এমন ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে, তা কল্পনাও করেননি কেউ।

স্ত্রী-সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নুর আলম বলেন, আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। চলাফেরা করতে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। এ জন্য একসঙ্গে সবাই গিয়েছিল। এখন সবাই…”—এ কথা বলেই থেমে যান তিনি। 

নুর আলমের সাত বছরের সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ চুয়াডাঙ্গার প্রদীপন মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। যে বয়সে স্কুল, খেলাধুলা আর পরিবারের স্নেহে দিন কাটানোর কথা, সেই বয়সেই আগুন কেড়ে নিল তার জীবন।

আজ শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।

এদিকে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় নুর আলমের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তাঁদের কক্ষটি তালাবদ্ধ। যে বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে টানা আট বছর ধরে বসবাস করছিলেন তিনি, সেই বাড়ি এখন তাঁদের অনুপস্থিতিতে নিস্তব্ধ।

বাড়ির মালিক হারুন আর রশিদ বলেন, টানা আট বছর ধরে আমার বাড়ির তৃতীয় তলায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন নুর আলম। তাঁরা খুবই ভালো মনের মানুষ। ঘটনা শোনার পর তিনি ঢাকায় শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছেন। আসলে এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা।

কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া পরিবারটির ফেরার কথা ছিল আজ শনিবার। কিন্তু সেই ফেরার অপেক্ষা আর পূরণ হলো না। চুয়াডাঙ্গার ভাড়া বাসায় তাঁদের ফিরে আসার বদলে রয়ে গেল তালাবদ্ধ ঘর, আর নুর আলমের জীবনে রয়ে গেল এমন এক শূন্যতা, যা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।

এএইচ

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

স্ত্রী-সন্তানসহ ছয় স্বজনকে কক্সবাজার রেখে চুয়াডাঙ্গায় ফিরেছিলেন নুর আলম, আগুনে নিভল সবার প্রাণ

স্ত্রী-সন্তানসহ ছয় স্বজনকে কক্সবাজার রেখে চুয়াডাঙ্গায় ফিরেছিলেন নুর আলম, আগুনে নিভল সবার প্রাণ

প্রকাশের সময় : ০৫:২৭:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ছয়জন সদস্যকে হারিয়েছেন চাকরির সুবাদে চুয়াডাঙ্গায় বসবাসরত নুর আলম। একসঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির ও সাত বছরের সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ফারিহার তিন বোন ও এক ভাই। কিন্তু সেই ভ্রমণই পরিবারের জন্য হয়ে উঠল এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। আগুনে স্ত্রী-সন্তানসহ ছয়জনের মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নুর আলম।

নুর আলম বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা। চাকরির সুবাদে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে টানা ৮ বছর বসবাস করে আসছেন। ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চুয়াডাঙ্গা মেডিকেল প্রমোশন অফিসার (এমপিও) হিসেবে কর্মরত নুর আলমের সংসারজুড়ে ছিল স্ত্রী-সন্তানকে ঘিরে স্বপ্ন ও ভালোবাসা। সেই সংসারেই এখন নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

মুঠোফোনে রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে নুর আলম জানান, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তিনি, তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির, সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ, তিন শ্যালিকা ও এক শ্যালক কক্সবাজারে বেড়াতে যান। তবে অফিসের কাজ থাকায় শুক্রবার তিনি তাঁদের সেখানে রেখে কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। আজ শনিবার সকালে ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঢাকায় ছুটে যান তিনি।

নুর আলম বলেন, আজ শনিবার কক্সবাজার থেকে তাদের ফিরে আসার কথা ছিল। কীভাবে রিসোর্টে আগুন লাগল, জানি না। সেখানে আটকা পড়ে আমার স্ত্রী, সন্তানসহ ছয়জন মারা গেছে। এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না, যে স্ত্রী-সন্তানকে কয়েক দিন আগে বেড়াতে পাঠিয়েছিলেন, তাঁদের আর কখনো ফিরে পাওয়া হবে না।

নুর আলম আরও জানান, তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির অসুস্থ ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে তাঁকে অন্যের সাহায্য নিতে হতো। এ কারণে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন, যাতে তাঁর দেখাশোনায় সুবিধা হয়। কিন্তু সেই একসঙ্গে যাওয়াই শেষ পর্যন্ত এমন ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে, তা কল্পনাও করেননি কেউ।

স্ত্রী-সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নুর আলম বলেন, আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। চলাফেরা করতে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। এ জন্য একসঙ্গে সবাই গিয়েছিল। এখন সবাই…”—এ কথা বলেই থেমে যান তিনি। 

নুর আলমের সাত বছরের সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ চুয়াডাঙ্গার প্রদীপন মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। যে বয়সে স্কুল, খেলাধুলা আর পরিবারের স্নেহে দিন কাটানোর কথা, সেই বয়সেই আগুন কেড়ে নিল তার জীবন।

আজ শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।

এদিকে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় নুর আলমের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তাঁদের কক্ষটি তালাবদ্ধ। যে বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে টানা আট বছর ধরে বসবাস করছিলেন তিনি, সেই বাড়ি এখন তাঁদের অনুপস্থিতিতে নিস্তব্ধ।

বাড়ির মালিক হারুন আর রশিদ বলেন, টানা আট বছর ধরে আমার বাড়ির তৃতীয় তলায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন নুর আলম। তাঁরা খুবই ভালো মনের মানুষ। ঘটনা শোনার পর তিনি ঢাকায় শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছেন। আসলে এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা।

কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া পরিবারটির ফেরার কথা ছিল আজ শনিবার। কিন্তু সেই ফেরার অপেক্ষা আর পূরণ হলো না। চুয়াডাঙ্গার ভাড়া বাসায় তাঁদের ফিরে আসার বদলে রয়ে গেল তালাবদ্ধ ঘর, আর নুর আলমের জীবনে রয়ে গেল এমন এক শূন্যতা, যা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।

এএইচ