১০:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় তীব্র গরমে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর : ভয়াবহ পরিস্থিতির শঙ্কা!

তীব্র গরমে চুয়াডাঙ্গা সদর, দামুড়হুদা ও আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। পানি পেতে ইলেকট্রিক মোটর নামানো হচ্ছে মাটির ১০ থেকে ১২ফুট গভীরে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বিএডিসি ক্ষুদ্র সেচ দপ্তর বলছে, অপরিকল্পিতভাবে শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি তোলা এবং যত্রতত্র পুকুর-খাল-বিল ভরাট করে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দামুড়হুদা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কিছু কিছু স্থানে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে পাম্প নামানো হচ্ছে মাটির ১০-১২ ফুট গভীরে।

বিশেষ করে দামুড়হুদা উপজেলার সদর ইউনিয়ন, সদাবরী, মদনা, দর্শনা, নতিপোতা, হাউলি, কুড়ুলগাছি, কার্পাসডাঙ্গা, কুতুবপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে বহু নলকূপে একেবারেই পানি উঠছে না। কিছু কিছু নলকূপে কম পানি উঠছে। অনেকের নলকূপের পানি কম ওঠায় নতুন স্থানে নলকূপ বসিয়েও লাভ হচ্ছে না।

দামুড়হুদা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দামুড়হুদা উপজেলায় সরকারি সাড়ে পাঁচ হাজার ও ব্যক্তি মালিকানা মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন এলাকার নলকূপে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, নলকূপে পানি না উঠলেও আবারও পানির চাহিদা মেটাতে গভীর নলকূপ বসানোর দিকেই ঝুঁকছেন অনেকে। পানির চাহিদা পূরণ করতে ১০-১২ ফুট গর্ত খুঁড়ে মাটির রিং বসিয়ে পাম্প নিচে নামিয়ে পানি ওঠানোর চেষ্টা করছেন কেউ কেউ।

দামুড়হুদা সদর ইউনিয়নের দশমী পাড়ার মানিক আলী বলেন, ‘আগে ১৫-২০ মিনিট বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে বাড়ির ছাদের ট্যাংক ভর্তি হয়ে যেতো। প্রায় দুই মাস মতো লক্ষ্য করছি দুই থেকে তিন ঘণ্টা মোটর চালু থাকলেও ট্যাংক ভর্তি হচ্ছে না।’

একই এলাকার নাজিম উদ্দীন বলেন, টিউবওয়েলের পানি ওঠা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সামান্য পানি উঠলেও টিউবওয়েল চাপতে অনেক শক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে। কয়েকদিন আগে ১২ ফুট গর্ত খুঁড়ে মোটর নামানোর পর মোটরে পানি উঠেছে।’

দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মঈন আলী বলেন, ‘মণ্টু মেশিন (ছোট শ্যালোমেশিন) দিয়ে পানি একেবারেই উঠছে না। কয়েক স্থানে তো বন্ধ হয়েই গেছে। এখন আমাদের ডিপ পাম্প দিয়ে সেচের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। তাছাড়া ডিপ পাম্পও একটি সমস্যা। অনেক ছোট চাষির মণ্টু মেশিন ছিল। কিন্তু তারা এখন বিপাকে পড়েছেন।’

দামুড়হুদার উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল করিম বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে কয়েকটি গ্রামে টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছু টিউবওয়েলে পানি উঠলেও পরিমাণে খুবই কম। বাধ্য হয়ে অনেকে বাড়িতে বৈদ্যুতিক মোটর ৮-১০ ফুট নিচে নামিয়ে পানি তুলছেন।’

দামুড়হুদা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হজরত আলী বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়ন এবং পাশ্ববর্তী বেশকিছু জায়গায় তীব্র তাপদাহের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। টিউবওয়েলের পানি খুবই কম উঠছে। মাঠের সেচ পাম্পগুলোর একই অবস্থা।’

দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ুলগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই টিউবওয়েলে পানি ওঠা কমে গেছে। মাঝে তো কয়েকটি গ্রামের কিছু টিউবওয়েলে পানিই উঠছিল না। এখনো এ ধরনের কিছু টিউবওয়েল বন্ধ হয়ে আছে। কিছু টিউবওয়েলে পানি ওঠার পরিমাণ একেবারেই কম।’

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী) রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর ৬ থেকে ৮ ফুট নিচে নামছে পানির স্তর। বছর দশেক আগেও দামুড়হুদায় ৪০-৬০ ফুটের মধ্যে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর ছিল। এখন বর্ষা মৌসুমে ১০০-১৪০ ফুটের মধ্যে পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, অপরিকল্পিতভাবে শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি তোলা এবং যত্রতত্র পুকুর-খাল-বিল ভরাট করে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সামনে বৃষ্টিপাত না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

পানি নিয়ে কয়েক বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে কাজ করছে সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা রিসো। রিসোর নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে পানির একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। জেলার সবকটি উপজেলাতেই এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এর জন্য আমাদের অসচেতনতা প্রধানত দায়ী। জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। যেখানে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করা হচ্ছে। সেই পুকুরেও ভূগর্ভস্থ পানি দেয়া হচ্ছে ইঞ্জিনচালিত মেশিনে। সরকারি হিসেবে সেচ কাজে জেলায় ৯০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ থেকে ব্যবহার করা হয়। তবে আমাদের হিসেবে চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রায় ৯৭ শতাংশ সেচ পানিই ভূগর্ভস্থ। কিন্তু এখন সমস্যা দেখা দিয়েছে, বিভিন্ন এলাকার সেচ পাম্পে পানি উঠছে না। ডিপ পাম্প বসানো হচ্ছে। মূলত ডিপ পাম্প থেকেই সেচ ব্যবস্থা টিকে আছে। আমরা শঙ্কিত। এই পরিস্তিতি কোন দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম করছি। বিশেষ করে এই জেলার নদী থেকে খুব বেশি সেচ ব্যবস্থা নেই্। এখন প্রয়োজন নদীর পানি ব্যবহারে উদগ্রীব হওয়া। তাছাড়া, জেলার জিকে খালের মাধ্যমে অনেক জমি চাষ করা হয়ে থাকে, তবে সেটিতেও বেশিরভাগ সময় পানি ছাড়া হয় না। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়বে।’

বিএডিসি ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প চুয়াডাঙ্গা জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহজালাল আবেদীন বলেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। অতিমাত্রায় খরা। এখন বোরো মৌসুমের শেষের দিকে। বোরো মৌসুমে প্রচুর পানি ব্যবহার করা হয়। অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের কারণে ধীরে ধীরে পানির লেভেল নিচে নেমে গেছে। সাধারণত যেগুলো দিয়ে সেচ কাজ করা হয়ে থাকে, সেগুলো আমরা সাকসেক মুড সেচ পাম্প বলে থাকি। এই পাম্পগুলোর হেড থাকে ২৫ থেকে ৩০ ফিট। এর নিচে ওয়াটার লেভেল চলে গেলে, পাম্প পানি ওঠাতে পারে না। আর তাছাড়া একটি স্থান থেকে পানি ওঠালে চারপাশ থেকে পানি এসে ওই স্থানটি রিকভারি হতে সময় লাগে। এ কারণেই পাম্পগুলো থেকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, যদি সম্ভব হয় তাহলে সাব মার্সিবল পাম্প ব্যবহার করার জন্য। সাব মার্সিবল পাম্প পানি স্তরের মধ্যে থাকে, এটি পানি পাম্প করে ওপরে তোলে। আরেকটি পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, যেখানে বোরিংটা করা আছে, সেখানে মোটরটা আরেকটু নিচে নামিয়ে পানি তোলা। তাহলে হয়ত পানি তুলতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী নদীগুলোতে পানি খুব বেশি নেই। আমাদের জেলায় একটি বড় সেচ প্রকল্প জিকে সেচ প্রকল্প আছে। সেটিতেও পানি দেয়া হচ্ছে না। জিকে খালে পানি দিলে অনেক জমি চাষ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি ওয়াটার লেভেলও উন্নত হয়।’ এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এই সমস্যাটি আমাদের পাশের জেলা কুষ্টিয়াতে আরও বেশি। যখন প্রাকৃতিক কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তখন সেটিকে মোকাবিলা করা সহজ কাজ নয়। সকলের সচেতনতা প্রয়োজন। যত্রতত্র পুকুর খনন করা, শ্যালোমেশিন দিয়ে অত্যাধিক পানি উত্তোলন করা এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।’

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গাসহ সারাদেশে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

চুয়াডাঙ্গায় তীব্র গরমে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর : ভয়াবহ পরিস্থিতির শঙ্কা!

প্রকাশের সময় : ১১:২৬:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৪

তীব্র গরমে চুয়াডাঙ্গা সদর, দামুড়হুদা ও আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। পানি পেতে ইলেকট্রিক মোটর নামানো হচ্ছে মাটির ১০ থেকে ১২ফুট গভীরে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বিএডিসি ক্ষুদ্র সেচ দপ্তর বলছে, অপরিকল্পিতভাবে শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি তোলা এবং যত্রতত্র পুকুর-খাল-বিল ভরাট করে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দামুড়হুদা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কিছু কিছু স্থানে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে পাম্প নামানো হচ্ছে মাটির ১০-১২ ফুট গভীরে।

বিশেষ করে দামুড়হুদা উপজেলার সদর ইউনিয়ন, সদাবরী, মদনা, দর্শনা, নতিপোতা, হাউলি, কুড়ুলগাছি, কার্পাসডাঙ্গা, কুতুবপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে বহু নলকূপে একেবারেই পানি উঠছে না। কিছু কিছু নলকূপে কম পানি উঠছে। অনেকের নলকূপের পানি কম ওঠায় নতুন স্থানে নলকূপ বসিয়েও লাভ হচ্ছে না।

দামুড়হুদা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দামুড়হুদা উপজেলায় সরকারি সাড়ে পাঁচ হাজার ও ব্যক্তি মালিকানা মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন এলাকার নলকূপে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে, নলকূপে পানি না উঠলেও আবারও পানির চাহিদা মেটাতে গভীর নলকূপ বসানোর দিকেই ঝুঁকছেন অনেকে। পানির চাহিদা পূরণ করতে ১০-১২ ফুট গর্ত খুঁড়ে মাটির রিং বসিয়ে পাম্প নিচে নামিয়ে পানি ওঠানোর চেষ্টা করছেন কেউ কেউ।

দামুড়হুদা সদর ইউনিয়নের দশমী পাড়ার মানিক আলী বলেন, ‘আগে ১৫-২০ মিনিট বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে বাড়ির ছাদের ট্যাংক ভর্তি হয়ে যেতো। প্রায় দুই মাস মতো লক্ষ্য করছি দুই থেকে তিন ঘণ্টা মোটর চালু থাকলেও ট্যাংক ভর্তি হচ্ছে না।’

একই এলাকার নাজিম উদ্দীন বলেন, টিউবওয়েলের পানি ওঠা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সামান্য পানি উঠলেও টিউবওয়েল চাপতে অনেক শক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে। কয়েকদিন আগে ১২ ফুট গর্ত খুঁড়ে মোটর নামানোর পর মোটরে পানি উঠেছে।’

দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মঈন আলী বলেন, ‘মণ্টু মেশিন (ছোট শ্যালোমেশিন) দিয়ে পানি একেবারেই উঠছে না। কয়েক স্থানে তো বন্ধ হয়েই গেছে। এখন আমাদের ডিপ পাম্প দিয়ে সেচের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। তাছাড়া ডিপ পাম্পও একটি সমস্যা। অনেক ছোট চাষির মণ্টু মেশিন ছিল। কিন্তু তারা এখন বিপাকে পড়েছেন।’

দামুড়হুদার উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল করিম বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে কয়েকটি গ্রামে টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছু টিউবওয়েলে পানি উঠলেও পরিমাণে খুবই কম। বাধ্য হয়ে অনেকে বাড়িতে বৈদ্যুতিক মোটর ৮-১০ ফুট নিচে নামিয়ে পানি তুলছেন।’

দামুড়হুদা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হজরত আলী বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়ন এবং পাশ্ববর্তী বেশকিছু জায়গায় তীব্র তাপদাহের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। টিউবওয়েলের পানি খুবই কম উঠছে। মাঠের সেচ পাম্পগুলোর একই অবস্থা।’

দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ুলগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামাল বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই টিউবওয়েলে পানি ওঠা কমে গেছে। মাঝে তো কয়েকটি গ্রামের কিছু টিউবওয়েলে পানিই উঠছিল না। এখনো এ ধরনের কিছু টিউবওয়েল বন্ধ হয়ে আছে। কিছু টিউবওয়েলে পানি ওঠার পরিমাণ একেবারেই কম।’

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী) রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর ৬ থেকে ৮ ফুট নিচে নামছে পানির স্তর। বছর দশেক আগেও দামুড়হুদায় ৪০-৬০ ফুটের মধ্যে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর ছিল। এখন বর্ষা মৌসুমে ১০০-১৪০ ফুটের মধ্যে পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, অপরিকল্পিতভাবে শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি তোলা এবং যত্রতত্র পুকুর-খাল-বিল ভরাট করে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সামনে বৃষ্টিপাত না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

পানি নিয়ে কয়েক বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে কাজ করছে সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা রিসো। রিসোর নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে পানির একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। জেলার সবকটি উপজেলাতেই এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এর জন্য আমাদের অসচেতনতা প্রধানত দায়ী। জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। যেখানে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করা হচ্ছে। সেই পুকুরেও ভূগর্ভস্থ পানি দেয়া হচ্ছে ইঞ্জিনচালিত মেশিনে। সরকারি হিসেবে সেচ কাজে জেলায় ৯০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ থেকে ব্যবহার করা হয়। তবে আমাদের হিসেবে চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রায় ৯৭ শতাংশ সেচ পানিই ভূগর্ভস্থ। কিন্তু এখন সমস্যা দেখা দিয়েছে, বিভিন্ন এলাকার সেচ পাম্পে পানি উঠছে না। ডিপ পাম্প বসানো হচ্ছে। মূলত ডিপ পাম্প থেকেই সেচ ব্যবস্থা টিকে আছে। আমরা শঙ্কিত। এই পরিস্তিতি কোন দিকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম করছি। বিশেষ করে এই জেলার নদী থেকে খুব বেশি সেচ ব্যবস্থা নেই্। এখন প্রয়োজন নদীর পানি ব্যবহারে উদগ্রীব হওয়া। তাছাড়া, জেলার জিকে খালের মাধ্যমে অনেক জমি চাষ করা হয়ে থাকে, তবে সেটিতেও বেশিরভাগ সময় পানি ছাড়া হয় না। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়বে।’

বিএডিসি ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প চুয়াডাঙ্গা জোনের সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহজালাল আবেদীন বলেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই। অতিমাত্রায় খরা। এখন বোরো মৌসুমের শেষের দিকে। বোরো মৌসুমে প্রচুর পানি ব্যবহার করা হয়। অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের কারণে ধীরে ধীরে পানির লেভেল নিচে নেমে গেছে। সাধারণত যেগুলো দিয়ে সেচ কাজ করা হয়ে থাকে, সেগুলো আমরা সাকসেক মুড সেচ পাম্প বলে থাকি। এই পাম্পগুলোর হেড থাকে ২৫ থেকে ৩০ ফিট। এর নিচে ওয়াটার লেভেল চলে গেলে, পাম্প পানি ওঠাতে পারে না। আর তাছাড়া একটি স্থান থেকে পানি ওঠালে চারপাশ থেকে পানি এসে ওই স্থানটি রিকভারি হতে সময় লাগে। এ কারণেই পাম্পগুলো থেকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, যদি সম্ভব হয় তাহলে সাব মার্সিবল পাম্প ব্যবহার করার জন্য। সাব মার্সিবল পাম্প পানি স্তরের মধ্যে থাকে, এটি পানি পাম্প করে ওপরে তোলে। আরেকটি পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, যেখানে বোরিংটা করা আছে, সেখানে মোটরটা আরেকটু নিচে নামিয়ে পানি তোলা। তাহলে হয়ত পানি তুলতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী নদীগুলোতে পানি খুব বেশি নেই। আমাদের জেলায় একটি বড় সেচ প্রকল্প জিকে সেচ প্রকল্প আছে। সেটিতেও পানি দেয়া হচ্ছে না। জিকে খালে পানি দিলে অনেক জমি চাষ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি ওয়াটার লেভেলও উন্নত হয়।’ এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এই সমস্যাটি আমাদের পাশের জেলা কুষ্টিয়াতে আরও বেশি। যখন প্রাকৃতিক কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তখন সেটিকে মোকাবিলা করা সহজ কাজ নয়। সকলের সচেতনতা প্রয়োজন। যত্রতত্র পুকুর খনন করা, শ্যালোমেশিন দিয়ে অত্যাধিক পানি উত্তোলন করা এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।’