০৯:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন : পেটে লাথির পর গর্ভেই মৃত্যু ৭ মাসের সন্তানের, স্বামী গ্রেপ্তার

Ada. Munna Telecom1

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতন ও পেটে লাথি মারার অভিযোগ উঠেছে এক মাদকাসক্ত স্বামীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছিল ওই স্বামী। সর্বশেষ নির্যাতনের ঘটনায় গর্ভে থাকা সাত মাসের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনাটি উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের কয়া গ্রামে। অভিযুক্ত স্বামী বিপ্লব (২৪) একই গ্রামের সাহাবুলের ছেলে। ভুক্তভোগী শিখা খাতুন (১৮) ওই গ্রামের সাইফুল ইসলামের মেয়ে। এ ঘটনায় গতকাল বুধবার ভুক্তভোগী স্ত্রী শিখা খাতুন বাদি হয়ে জীবননগর থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত স্বামী বিপ্লবকে গ্রেপ্তার করে।

এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই বিপ্লব বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীর কাছে যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন দাবি করে আসছিল। কিন্তু শিখা খাতুনের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় এসব দাবি পূরণ করতে পারেনি। এ কারণে প্রায়ই তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী শিখা খাতুন জানান, গত ২৬ মে রাতে যৌতুকের দাবিতে তার ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় স্বামী বিপ্লব তাকে মারধর করার পাশাপাশি তার পেটে লাথি মারে। ওই ঘটনার পরও নির্যাতনের মাত্রা কমেনি।

শিখা খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে রাত প্রায় ১০টার দিকে বিপ্লব বাজার থেকে বাড়ি ফিরে আবারও তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে শুরু করে। একপর্যায়ে এক লাখ টাকা, একটি মোটরসাইকেল ও একটি মোবাইল ফোন দাবি করে। তখন শিখা খাতুন স্বামীকে জানান, তার বাবা একজন দরিদ্র মানুষ এবং এত টাকা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এই কথা শুনে বিপ্লব আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, সে শিখা খাতুনকে বেধড়ক মারধর করে এবং তার পেটে সজোরে লাথি মারে। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে জীবননগরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে পরদিন ১ জুন বিকেলে তাকে জীবননগর মনোয়ারা সনো সেন্টারে নিয়ে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়।

সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গর্ভের সন্তানের কোনো হৃদস্পন্দন খুঁজে পাননি। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে প্রায় এক ঘণ্টা অক্সিজেন দিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এরপর পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হলেও সন্তানের হার্টবিট পাওয়া যায়নি। পরে একটি ক্লিনিকে শিখা খাতুন মৃত সন্তান প্রসব করেন।

সন্তান হারানোর বেদনা আর নির্যাতনের স্মৃতি বুকে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিখা খাতুন বলেন, “আমার স্বামী আমার বাবার আর্থিক অবস্থা জেনেশুনেই বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই টাকা, মোবাইল ও মোটরসাইকেলের জন্য চাপ দিতে থাকে। দাবি পূরণ করতে না পারায় আমাকে প্রায়ই মারধর করত। ঘটনার দিন পেটে লাথি মারার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। হাসপাতালে নেয়ার পর জানতে পারি আমার ৭ মাসের সন্তান আর বেঁচে নেই। আমি এর বিচার চাই।”

জীবননগর থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মো. সোলায়মান শেখ রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, ভুক্তভোগী শিখা খাতুন বাদী হয়ে বুধবার সন্ধ্যায় তার স্বামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে ভ্রূণ হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত বিপ্লবকে গ্রেফতার করেছে। মৃত ভ্রূণের ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, যৌতুকের দাবিতে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর ওপর এমন নির্মম নির্যাতন এবং গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

আগামীকাল শনিবার চুয়াডাঙ্গায় সেসব এলাকায় টানা ৮ ঘন্টা বিদ্যুৎ বন্ধ থাকবে

চুয়াডাঙ্গায় যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন : পেটে লাথির পর গর্ভেই মৃত্যু ৭ মাসের সন্তানের, স্বামী গ্রেপ্তার

প্রকাশের সময় : ১০:৫২:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতন ও পেটে লাথি মারার অভিযোগ উঠেছে এক মাদকাসক্ত স্বামীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছিল ওই স্বামী। সর্বশেষ নির্যাতনের ঘটনায় গর্ভে থাকা সাত মাসের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনাটি উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের কয়া গ্রামে। অভিযুক্ত স্বামী বিপ্লব (২৪) একই গ্রামের সাহাবুলের ছেলে। ভুক্তভোগী শিখা খাতুন (১৮) ওই গ্রামের সাইফুল ইসলামের মেয়ে। এ ঘটনায় গতকাল বুধবার ভুক্তভোগী স্ত্রী শিখা খাতুন বাদি হয়ে জীবননগর থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত স্বামী বিপ্লবকে গ্রেপ্তার করে।

এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই বিপ্লব বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীর কাছে যৌতুক হিসেবে নগদ টাকা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন দাবি করে আসছিল। কিন্তু শিখা খাতুনের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় এসব দাবি পূরণ করতে পারেনি। এ কারণে প্রায়ই তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী শিখা খাতুন জানান, গত ২৬ মে রাতে যৌতুকের দাবিতে তার ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় স্বামী বিপ্লব তাকে মারধর করার পাশাপাশি তার পেটে লাথি মারে। ওই ঘটনার পরও নির্যাতনের মাত্রা কমেনি।

শিখা খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে রাত প্রায় ১০টার দিকে বিপ্লব বাজার থেকে বাড়ি ফিরে আবারও তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে শুরু করে। একপর্যায়ে এক লাখ টাকা, একটি মোটরসাইকেল ও একটি মোবাইল ফোন দাবি করে। তখন শিখা খাতুন স্বামীকে জানান, তার বাবা একজন দরিদ্র মানুষ এবং এত টাকা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এই কথা শুনে বিপ্লব আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, সে শিখা খাতুনকে বেধড়ক মারধর করে এবং তার পেটে সজোরে লাথি মারে। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে জীবননগরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে পরদিন ১ জুন বিকেলে তাকে জীবননগর মনোয়ারা সনো সেন্টারে নিয়ে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়।

সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গর্ভের সন্তানের কোনো হৃদস্পন্দন খুঁজে পাননি। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে প্রায় এক ঘণ্টা অক্সিজেন দিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এরপর পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হলেও সন্তানের হার্টবিট পাওয়া যায়নি। পরে একটি ক্লিনিকে শিখা খাতুন মৃত সন্তান প্রসব করেন।

সন্তান হারানোর বেদনা আর নির্যাতনের স্মৃতি বুকে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিখা খাতুন বলেন, “আমার স্বামী আমার বাবার আর্থিক অবস্থা জেনেশুনেই বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই টাকা, মোবাইল ও মোটরসাইকেলের জন্য চাপ দিতে থাকে। দাবি পূরণ করতে না পারায় আমাকে প্রায়ই মারধর করত। ঘটনার দিন পেটে লাথি মারার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। হাসপাতালে নেয়ার পর জানতে পারি আমার ৭ মাসের সন্তান আর বেঁচে নেই। আমি এর বিচার চাই।”

জীবননগর থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মো. সোলায়মান শেখ রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, ভুক্তভোগী শিখা খাতুন বাদী হয়ে বুধবার সন্ধ্যায় তার স্বামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে ভ্রূণ হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত বিপ্লবকে গ্রেফতার করেছে। মৃত ভ্রূণের ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, যৌতুকের দাবিতে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর ওপর এমন নির্মম নির্যাতন এবং গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।