চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় গত দুদিনের ব্যবধানে আবারো সড়কে ব্যারিকেট দিয়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এতে জনমতে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকেই দুষছেন ভুক্তভোগীরা। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে এ পর্যন্ত একই উপজেলায় অর্থাৎ দামুড়হুদাতে তিনটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলো।
চুয়াডাঙ্গায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছিনতাই, ডাকাতি, সহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৫-ই অগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর ব্যাপক হামলা, অনাস্থা আর আন্দোলনের সময় বিতর্কিত ভূমিকার জন্য পুলিশ কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় কেউ কেউ সুযোগ নিয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেই অপরাধ চক্রগুলো সুযোগ নিচ্ছে। আবার নতুন করে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ার ভয়েও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। এসব কারণে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে করেন, যা জনজীবনে উদ্বেগ তৈরি করছে।
যদিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র্যাব ছাড়াও সেনাবাহিনী এখনো মাঠে আছে বলে জানানো হয়েছে এবং তারা আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের দাবি, ডাকাতি না, ছোটখাটো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আলোর সল্পতার কারণে গ্রামীন সড়কে বেশিরভাগ সময়ে এ ঘটনা ঘটছে। এ সব সড়কে লাইটের ব্যবস্থা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে কঠিন হয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। অপরাধীদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
আরও পড়ুন
দামুড়হুদায় এক রাতে ২ স্থানে গণডাকাতি, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগত টাকা লুটের অভিযোগ
জানা যায়, গত সোমবার (২ ডিসেম্বর) রাত ১২ টার দিকে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দামুড়হুদা মডেল থানাধীন পরানপুর-লোকনাথপুর সড়কে ডাকাতির কবলে পড়ে রোগীবাহি একটি অ্যাম্বুলেন্স ও পাখিভ্যানের যাত্রীরা। এ সময় যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগত টাকা লুট করে পালিয়ে যায় ডাকাত দল। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছালেও কাউকেই আটক করতে পারিনি।
দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা পৌরসভাধীন এলাকার তরফদার ক্লিনিকের মালিক সোহেল গণমাধ্যমকে বলেন, সোমবার রাত ৮ টার দিকে উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামের আব্দুল জলিল নামে এক রোগীকে নিয়ে স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসক রকি ক্লিনিকে আসেন। রোগীর অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। তাৎক্ষনিক আমার প্রতিষ্ঠানের অ্যাম্বুলেন্সযোগে রোগীতে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ সময় পরানপুর-লোকনাথপুর সড়কের ধাপড়ী মাঠে পৌঁছালে ৫-৬ জনের মুখোশধারী ডাকাত দল সড়কে খেজুর গাছ ফেলে তাদের দেড় ঘণ্টা পথরোধ করে রাখে। প্রথমে তাদের মোবাইল ফোনগুলো কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর যাত্রীদের কাছ থেকে নগত ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে দামুড়হুদা মডেল থানা থেকে পুলিশ আসার খবর পেয়ে ডাকাত সদস্যরা পালিয়ে যায়। শুনেছি এরপর ব্যটারিচালিত দুটি পাখি ভ্যানও ছিনতাইকারিদের কবলে পড়েছে।
আলমডাঙ্গায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে গণডাকাতি : পিটিয়ে নগত টাকা-স্বর্ণালংকার লুট
এদিকে, একই স্থানে গত শনিবার (৩০ নভেম্বর) রাত ১০ টার দিকে দামুড়হুদা মডেল থানাধীন পরানপুর-লোকনাথপুর সড়কের ধাপড়ী মাঠ নামকস্থানে সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। মুখোশধারী ডাকাতদের সদস্যরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ৪ জন পথচারীর নিকট থেকে নগত টাকা লুট করে নেয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শনিবার (৩০ নভেম্বর) রাত ১০টার দিকে দর্শনা বাজার থেকে প্রাণ কোম্পানীর ডেলিভারি ম্যান কাদিপুর গ্রামের জব্বার আলী (২৪) তার নিজ বাড়িতে ফেরার পথে পরানপুর-লোকনাথপুর সড়কের ধাপড়ী মাঠের মধ্যে সড়কের ব্যারিকেড সৃষ্টি করে গতিরোধ করে মুখোশধারী ডাকাতদল। এরপর ধরে তার হাত-মুখ বেঁধে ১২ হাজার ১৮৫ টাকা, একটি বাইসাইকেল ও একটি স্মার্টফোন কেড়ে নেয়।
আরও পড়ুন
চুয়াডাঙ্গায় অফিসে ঢুকে এনজিও কর্মীর বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে লুটের চেষ্টা
এছাড়া উপজেলার তারিনীপুর গ্রামের আশিক (৩০) ও সাব্বির হোসেনের (৩২) কাছ থেকে ২টি বাইসাইকেল, ২টি স্মার্ট ফোন লুট করে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার এদিন রাতে একই স্থানে এক অজ্ঞাত পথচারীর একটি বাইসাইকেল, কিছু নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ডাকাতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
ঘটনার পর পুলিশের টহলদল লোকনাথপুর তেল পাম্পের নিকট থেকে সন্দেহভাজন ডাকাত হিসেবে মাহফুজ হোসেন (২৫) নামের এক যুবককে আটক করা হয়। তার মানিব্যাগ তল্লাশি করে ৩ পিচ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে বলে। আটককৃত মাহফুজ হোসেন লোকনাথপুর গ্রামের মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে।
অপরদিকে, শনিবার (৩০ নভেম্বর) মধ্যরাত ৩-৪টার মধ্যে দর্শনা থানাধীন গোপালখালি ব্রিজ সংলগ্নস্থানে সড়কে গাছ ফেলে ঘন্টাব্যাপি তাণ্ডব চালাই। এ সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কার্পাসডাঙ্গাগামী গোল্ডেন লাইন পরিবহন, নিউ মডার্ন পরিবহন সহ বেশ কয়েকটি যাত্রীবাহি ইজিবাইকের যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে প্রায় লক্ষাধিক টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।
আরও পড়ুন
চুয়াডাঙ্গায় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গণডাকাতি, কুপিয়ে ও পিটিয়ে নগদ টাকা-স্বর্ণালঙ্কার লুট
ভুক্তভোগী নিউ মডার্ন পরিবহনের সুপারভাইজার মনির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, শনিবার (৩০ নভেম্বর) মধ্যরাতে সড়কে গাছের ব্যারিকেড দিয়ে গতিরোধ করে ডাকাতদল। এ সময় বাসটি থামতেই তারা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে তারা। আমার গাড়িতে থাকা ৫ জন যাত্রীর নিকট থেকে ২০/২৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। এছাড়া একটি পাখিভ্যানে থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে ৪০-৪৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়।
গোল্ডেন লাইন পরিবহনের সুপারভাইজার বলেন, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আমার নিকট থাকা নগত ৫ হাজার ৩৪ টাকা, এক যাত্রীর কাছ থেকে ৩৫ হাজার ছিনিয়ে নেই।
শনিবারের ডাকাতির ঘটনায় দর্শনা থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) শহিদ তিতুমীর রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেছিলেন, সড়কে গাছ ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে ছিনতাইকারীরা। এমন খবর পেয়ে আমিসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। এ ছাড়া আগে থেকেই সেখানে পুলিশের টহল ছিল। তাৎক্ষণিক পুলিশের উপস্থিতিতে কোন ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। আমি বাসের যাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেছি, তারা ডাকাতির শিকার হননি বলে জানিয়েছেন। সড়কে যে গাছটি দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছিল সেটি কেটে সরিয়ে দেয়া হয়।
আরও পড়ুন
চুয়াডাঙ্গায় লুট হওয়া চারটি গরু-ছাগল উদ্ধার, ৪ ডাকাত গ্রেপ্তার
এ দিকে, পুলিশ ও স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থলটি দামুড়হুদা মডেল থানা ও দর্শনা থানার সীমান্তবর্তী। এইস্থানের সড়ক নির্জন হওয়ায় ডাকাত-ছিনতাই করে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। সড়কে লাইটিং এর ব্যবস্থা না থানায় অপরাধীরা এই স্থানটিই বেচে নিচ্ছে বলে ধারণা স্থানীয় ও ভুক্তভোগীদের। দ্রুত এসব সড়কে লাইটিং ব্যবস্থা সহ পুলিশের টহল জোরদারের দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
গত সোমবার (২ ডিসেম্বর) রাতের ঘটনায় আজ বুধবার (৪ ডিসেম্বর) সকালে দামুড়হুদা থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) হুমায়ুন কবীর রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, এটা ডাকাতির ঘটনা না। ছিনতাইয়ের মত ঘটনা ঘটেছে। অ্যাম্বুলেন্স-পাখিভ্যানের যাত্রীদের থেকে সামান্য কিছু টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে বলে জেনেছি। আমরা অপরাধীদের দ্রুত ধরতে অভিযান চালাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, মূলত দুই থানার সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘটনাগুলো ঘটছে। এই স্থান খুবই নির্জন ও আলোবিহীন। তাই অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। আমরা টহল জোরদার করেছি।
আরও পড়ুন
নগত টাকা-স্বর্ণালঙ্কার লুট করতেই চুয়াডাঙ্গার অঞ্জলী রাণীকে হত্যা করা হয়
এ ঘটনার বিষয়ে জানতে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, ডাকাতি ঘটনার তথ্য আমার কাছে আসেনি। ছোটখাটো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে জেনেছি। সব স্থানে আমাদের ফোর্স যেতে পারেন না। মূল কারণ সড়কে লাইটের ব্যবস্থা না থাকা। মেইন সড়কগুলো রাত থেকে ভোর পর্যন্ত পুলিশের টহল থাকে। লোকাল সড়কে আলোর ব্যবস্থা না থাকায় কিছুটা ঘাটতি হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে ৩-৪টা অথবা কয়টা ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হচ্ছে কিনা এটা এখনো বিশ্লেষণ করেনি, আপনারা করতে পারেন। একটা দুইটা ঘটনা দিয়ে বিশ্লেষণ করার মতন না। তবে যেগুলো ঘটেছে এগুলো অবশ্যই খারাপ।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা বলেন, পরিবেশ অনেক সময় মানুষকে আকৃষ্ট করে অপরাধ করার জন্য। বিশেষ করে রাতে দর্শনা-মুজিবনগর সড়কে গেলে গা ছমছম অবস্থা হয়। কিছুস্থানে সড়কে লাইটিং এর ব্যবস্থা নেই। আর একটি থানায় সর্বোচ্চ ৩০-৪০ পুলিশ সদস্য থাকে। তাই এদের পক্ষেও সব স্থানে সব সময় টহল দেয়াও সম্ভব হয় না। সিসিটিভি ও আলোর যে স্বল্পতা, এ বিষয়ে আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। সব শেষে এই পরিস্থিতি এড়াতে সকলের সার্বিক প্রচেষ্টা ও সহযোগীতা ছাড়া পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
এএইচ
নিজস্ব প্রতিবেদক 























One thought on “চুয়াডাঙ্গায় আইনশৃঙ্খলার নাজুক অবস্থা : এবার অ্যাম্বুলেন্স-পাখিভ্যানের যাত্রীদের নগত টাকা লুট”