মাদকবিরোধী সামাজিক উদ্যোগকে কেন্দ্র করে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গাইদঘাটে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাদকবিরোধী সংগঠনের সদস্য, অভিযুক্ত মাদক কারবারি ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্রের আঘাত, মারধর, বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বাড়ির নারীদের ওপরও নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন এক পক্ষের সদস্যরা। ঘটনার জেরে আবারও দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক।
গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে সদর উপজেলার মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের গাইদঘাট গ্রামের দক্ষিণপাড়া মাঠে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। গতকাল আবারো দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে পুরো এলাকা থমথমে বিরাজ করছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের বিরোধ থেকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে বসতবাড়ি পর্যন্ত।

এ ঘটনায় এক পক্ষের আহতদের মধ্যে চারজনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের মধ্যে তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অপর একজনকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
আহতরা হলেন, দীননাথপুর গ্রামের মসজিদপাড়ার মৃত আবুল খায়েরের ছেলে মাসুম মিয়া (৩৮), গাইদঘাট দক্ষিণপাড়ার মৃত আত্তাব মাস্টারের ছেলে মহিদুল ইসলাম (৪৫), একই এলাকার জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী আকলিমা বেগম (৪৫) এবং মৃত আনু মিয়ার ছেলে নুরুল ইসলাম (৪০)।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় মামলা করতে গেলে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে চুয়াডাঙ্গা আদালতে ১১ জনকে আসামি করে দুটি মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, মাদক কারবারিদের প্রতিহত করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মাদকবিরোধী সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে গাইদঘাট দক্ষিণপাড়ার আব্দুর রহমানের ছেলে শাহিন এবং মজিনুর রহমান কটার ছেলে সিদ্দিকুর রহমান সামাদ গুরুতর আহত হন। তাঁদেরও উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ছাড়া আরিফুল ও জসিম মিয়াসহ আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে প্রথমিকভাবে জানা লেগে হাসপাতাল ত্থেকে তারা কোন চিকিৎসা নেননি। তাদের কাছে থাকা টাকা লুট এবং মোবাইল ফোন ভাঙচুরের অভিযোগও করেছেন তারা।
এ ঘটনায় মাদকবিরোধী পক্ষের করা মামলায় নয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার সাত নম্বর আসামি মহিদুল ইসলামকে আটক করেছে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ। ভুক্তভোগীদের করা অপর দুটি মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত মহিদুল ইসলামের স্ত্রী রোজিনা খাতুন বলেন, তার স্বামী আগে মাদক সেবন ও বিক্রি করতেন। তবে এলাকায় মাদকবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তাঁকে ধরে নিয়ে মারধর করা হয়। এরপর থেকে তিনি মাদক সেবন ও ব্যবসা ছেড়ে দেন বলে দাবি করেন রোজিনা। তার অভিযোগ, এরপরও শনিবার রাতে তার স্বামীসহ চার-পাঁচজনকে আবারও মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। তাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল, দিতে অস্বীকার করায় পরিবারের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

রোজিনা খাতুন আরও বলেন, ঘটনার পরদিন সকালে তার ছেলে বোনের বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন আনতে গেলে সাত-আটজন মিলে তাকে ধাওয়া করে। প্রাণে বেচে ছেলেটি কোনোমতে বাড়িতে ফিরে আসে বলে দাবি করেন তিনি।
মহিদুল ইসলামের ভাই জাহিদুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, শনিবার রাতে মহিদুলসহ দুই-তিনজন তাদের পুকুর ও ফসলের জমি দেখতে গেলে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা মাদকবিরোধী সামাজিক সংগঠনের কয়েকজন সদস্য তাদের ওপর হামলা চালান। তাদের হাতে হাসুয়া, ফালা, রামদা ও জিআই পাইপ ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। হামলার শিকার ব্যক্তিদের চিৎকার শুনে আত্মীয়স্বজন এগিয়ে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। এ সময় পাল্টা আক্রমণের ঘটনাও ঘটে বলে জানান জাহিদুল।
তার অভিযোগ, কিছুক্ষণ পর প্রায় ১০০ জনের একটি দল তাদের মহল্লায় প্রবেশ করে আবারও হামলা চালায়। এ সময় তার স্ত্রী তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে হাসুয়ার কোপে তার হাতের দুটি আঙুল নখসহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং আরেকটি আঙুলের মাঝের অংশ ঝুলে যায়। এ ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, মাদকবিরোধী সামাজিক সংগঠনের কর্মী আহত সামাদ মিয়া বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক বিক্রি বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধ করে আসছেন। কিন্তু তারা মাদক ব্যবসা বন্ধ না করে উল্টো হুমকি দিতেন। শনিবার রাতে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে পেয়ে আটক করার পর নিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন সামাদ। তার দাবি, পাইপ দিয়ে মাথায় আঘাত করায় মাথার দুটি স্থানে ফেটে যায়। এ সময় তার হাতে থাকা আইফোনও ভাঙচুর করা হয়।
সংগঠনটির আরেক কর্মী আরিফুল ইসলাম বলেন, তারা এখনো হুমকি-ধমকির মধ্যে রয়েছেন। হামলার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। তার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় ঘোরাফেরা করছেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, গত শনিবারের হামলা ও পাল্টা হামলার বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। এ ঘটনায় মাদকবিরোধী পক্ষের করা একটি মামলা হয়েছে এবং মহিদুল ইসলাম নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 















