০২:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইক দূর্ঘটনায় এক বছরে ১৬ জন নিহত

  • আফজালুল হক
  • প্রকাশের সময় : ০৭:৪৬:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ২৪৫ Views
Ada. Munna Telecom1

জেলায় বর্তমানে লক্ষাধিকের বেশি ইজিবাইক চলাচল করছে। অথচ চারটি পৌরসভার মধ্যে কেবল জীবননগর পৌরসভায় ২০২৪ সালে ২০৪টি ইজিবাইক নিবন্ধিতের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য কোনো পৌরসভায় থেকে তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাত জেলায় ইজিবাইকের সংখ্যা কত তা কোন দপ্তর নির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেনা। তবে জেলা ট্রাফিক পুলিশের হিসেবে প্রায় লক্ষাধিক ইজিবাইক জেলাজুড়ে চলছে। এর অধিকাংশই চলছে অদক্ষ ও কিশোর চালকের হাতে।

চুয়াডাঙ্গায় তেলবাহী ট্রাক ও ইজিবাইকের মুখোমুখী সংঘর্ষে নিহত ৩

চুয়াডাঙ্গা বিআরটিএ অফিসের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ইজিবাইক সংশ্লিষ্ট ২২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন।

সচেতন মহল ও ট্রাফিক পুলিশ বলছেন, এসব দুর্ঘটনার বড় অংশ ঘটছে কিশোর ও অদক্ষ চালকের বেপরোয়া আচরণ ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে। প্রশাসনের চোখের সামনেই ইজিবাইক-অটোরিকশা চললেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে জেলা ট্রাফিক পুলিশ বলছে, শুধু গত মাসেই ৪২টি মামলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চালকদের সচেতন করতেও কাজ চলছে।

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইকের ধাক্কায় অজ্ঞাত নারী নিহত, পরিবারকে খুঁজছে পুলিশ

একদিকে ইজিবাইকের চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দামও। কয়েক বছর আগে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় একটি ইজিবাইক কেনা যেত। বর্তমানে আড়াই লাখ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার নিচে কোনো ইজিবাইক নেই। চালক জসিম উদ্দিন বলেন, “শুরুতে ১ লাখ টাকা দিয়ে ইজিবাইক কিনেছিলাম। এখন সেই ইজিবাইকের দাম আড়াই থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।”

বিদ্যুতের ওপরও চাপ তৈরি করছে এসব যান। সদর উপজেলায় ৪০টি, দামুড়হুদায় ২১৭টি ও আলমডাঙ্গায় ২টি চার্জিং গ্যারেজ আছে। জীবননগরে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জিং গ্যারেজ না থাকলেও ঘরোয়াভাবে চার্জ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা।

বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) লিমিটেডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব দাবি করেন, “গ্যারেজ ও ব্যক্তিগত ইজিবাইক সাধারণত রাতে চার্জ দেওয়া হয়। এজন্য বড় ধরনের চাপ পড়ে না। তবে গরমের সময় লোডশেডিং কিছুটা বেড়ে যায়।”

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইক-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ১ : চারজনের অবস্থা আশংকাজনক

ইজিবাইকের কারণে তৈরি হওয়া যানজট এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে জানান সাধারণ যাত্রীরা। সদর হাসপাতালের সামনে অপেক্ষমাণ যাত্রী আব্দুল আওয়াল বলেন, “আগে ১০ মিনিটে যেতাম এমন রাস্তা এখন আধাঘণ্টায়ও যাওয়া যায় না। ইজিবাইক যেখানে খুশি থামে, উল্টোপথে চলে। দুর্ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে।”

তবে চালকদের বক্তব্য ভিন্ন। আকাশ নামের একজন ইজিবাইক চালক বলেন, “আমরা সংসার চালানোর জন্য ইজিবাইক চালাই। প্রতিদিন ভাড়া মিটিয়ে যা থাকে তা দিয়েই বাঁচি। কিন্তু মামলা আর হয়রানিতে কষ্ট হচ্ছে। সরকার যদি নিয়ম করতো, নিবন্ধন দিতো, তাহলে স্বস্তিতে গাড়ি চালাতে পারতাম।”

চুয়াডাঙ্গা ট্রাফিক পুলিশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে জানান, জেলাজুড়ে আনুমানিক প্রায় লক্ষাধিক ইজিবাইক রয়েছে। তাদের লাইসেন্স বা নিবন্ধন নেই। আগে পৌরসভা থেকে কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধন দেওয়া হতো, যা গত এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “শহরে প্রতিদিন অতিরিক্ত যানজট হয়। এজন্য অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করতে হয়। অনেক অদক্ষ চালক ও কিশোর ইজিবাইক চালায়, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। শুধু গত মাসেই ৪২টি মামলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চালকদের সচেতন করতেও কাজ চলছে।”

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গায় ঝালমুড়ি কিনে ফেরার পথে ইজিবাইকের ধাক্কায় প্রাণ গেল বৃদ্ধের

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চুয়াডাঙ্গা জেলা সভাপতি ও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, ইজিবাইক একদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ায় এটি এখন জনদুর্ভোগের কারণ। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়ন করে খাতটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। চুয়াডাঙ্গার মতো ছোট্ট জেলায় হাজার হাজার ইজিবাইক চলছে। দুর্ভোগ, জ্যাম, অদক্ষ চালকের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তবে শুধু নিয়ন্ত্রণ দিলেই সমাধান হবে না, আগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে তারা বেকার হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে, চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইকের সংখ্যা যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা, যানজট, বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় ইউপি সদস্যের বাড়িতে লুকানো ছিল ১০০০ লিটার ডিজেল: ১৫ দিনের কারাদণ্ড

চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইক দূর্ঘটনায় এক বছরে ১৬ জন নিহত

প্রকাশের সময় : ০৭:৪৬:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

জেলায় বর্তমানে লক্ষাধিকের বেশি ইজিবাইক চলাচল করছে। অথচ চারটি পৌরসভার মধ্যে কেবল জীবননগর পৌরসভায় ২০২৪ সালে ২০৪টি ইজিবাইক নিবন্ধিতের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য কোনো পৌরসভায় থেকে তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাত জেলায় ইজিবাইকের সংখ্যা কত তা কোন দপ্তর নির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেনা। তবে জেলা ট্রাফিক পুলিশের হিসেবে প্রায় লক্ষাধিক ইজিবাইক জেলাজুড়ে চলছে। এর অধিকাংশই চলছে অদক্ষ ও কিশোর চালকের হাতে।

চুয়াডাঙ্গায় তেলবাহী ট্রাক ও ইজিবাইকের মুখোমুখী সংঘর্ষে নিহত ৩

চুয়াডাঙ্গা বিআরটিএ অফিসের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ইজিবাইক সংশ্লিষ্ট ২২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন।

সচেতন মহল ও ট্রাফিক পুলিশ বলছেন, এসব দুর্ঘটনার বড় অংশ ঘটছে কিশোর ও অদক্ষ চালকের বেপরোয়া আচরণ ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে। প্রশাসনের চোখের সামনেই ইজিবাইক-অটোরিকশা চললেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে জেলা ট্রাফিক পুলিশ বলছে, শুধু গত মাসেই ৪২টি মামলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চালকদের সচেতন করতেও কাজ চলছে।

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইকের ধাক্কায় অজ্ঞাত নারী নিহত, পরিবারকে খুঁজছে পুলিশ

একদিকে ইজিবাইকের চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দামও। কয়েক বছর আগে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় একটি ইজিবাইক কেনা যেত। বর্তমানে আড়াই লাখ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার নিচে কোনো ইজিবাইক নেই। চালক জসিম উদ্দিন বলেন, “শুরুতে ১ লাখ টাকা দিয়ে ইজিবাইক কিনেছিলাম। এখন সেই ইজিবাইকের দাম আড়াই থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।”

বিদ্যুতের ওপরও চাপ তৈরি করছে এসব যান। সদর উপজেলায় ৪০টি, দামুড়হুদায় ২১৭টি ও আলমডাঙ্গায় ২টি চার্জিং গ্যারেজ আছে। জীবননগরে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জিং গ্যারেজ না থাকলেও ঘরোয়াভাবে চার্জ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা।

বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) লিমিটেডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব দাবি করেন, “গ্যারেজ ও ব্যক্তিগত ইজিবাইক সাধারণত রাতে চার্জ দেওয়া হয়। এজন্য বড় ধরনের চাপ পড়ে না। তবে গরমের সময় লোডশেডিং কিছুটা বেড়ে যায়।”

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইক-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ১ : চারজনের অবস্থা আশংকাজনক

ইজিবাইকের কারণে তৈরি হওয়া যানজট এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে জানান সাধারণ যাত্রীরা। সদর হাসপাতালের সামনে অপেক্ষমাণ যাত্রী আব্দুল আওয়াল বলেন, “আগে ১০ মিনিটে যেতাম এমন রাস্তা এখন আধাঘণ্টায়ও যাওয়া যায় না। ইজিবাইক যেখানে খুশি থামে, উল্টোপথে চলে। দুর্ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে।”

তবে চালকদের বক্তব্য ভিন্ন। আকাশ নামের একজন ইজিবাইক চালক বলেন, “আমরা সংসার চালানোর জন্য ইজিবাইক চালাই। প্রতিদিন ভাড়া মিটিয়ে যা থাকে তা দিয়েই বাঁচি। কিন্তু মামলা আর হয়রানিতে কষ্ট হচ্ছে। সরকার যদি নিয়ম করতো, নিবন্ধন দিতো, তাহলে স্বস্তিতে গাড়ি চালাতে পারতাম।”

চুয়াডাঙ্গা ট্রাফিক পুলিশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে জানান, জেলাজুড়ে আনুমানিক প্রায় লক্ষাধিক ইজিবাইক রয়েছে। তাদের লাইসেন্স বা নিবন্ধন নেই। আগে পৌরসভা থেকে কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধন দেওয়া হতো, যা গত এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “শহরে প্রতিদিন অতিরিক্ত যানজট হয়। এজন্য অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করতে হয়। অনেক অদক্ষ চালক ও কিশোর ইজিবাইক চালায়, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। শুধু গত মাসেই ৪২টি মামলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চালকদের সচেতন করতেও কাজ চলছে।”

আরও পড়ুন

চুয়াডাঙ্গায় ঝালমুড়ি কিনে ফেরার পথে ইজিবাইকের ধাক্কায় প্রাণ গেল বৃদ্ধের

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চুয়াডাঙ্গা জেলা সভাপতি ও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, ইজিবাইক একদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ায় এটি এখন জনদুর্ভোগের কারণ। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়ন করে খাতটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। চুয়াডাঙ্গার মতো ছোট্ট জেলায় হাজার হাজার ইজিবাইক চলছে। দুর্ভোগ, জ্যাম, অদক্ষ চালকের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তবে শুধু নিয়ন্ত্রণ দিলেই সমাধান হবে না, আগে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে তারা বেকার হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে, চুয়াডাঙ্গায় ইজিবাইকের সংখ্যা যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা, যানজট, বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।