চুয়াডাঙ্গা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আওতাধীন সদর উপজেলার রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ক্রয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে ব্যবসায়ী ও দালালদের কাছ থেকে নিম্নমানের ধান সংগ্রহ, বরাদ্দের বাইরে বিপুল পরিমাণ ধান কেনা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষক ও সচেতন মহল।
আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) চুয়াডাঙ্গার প্রভাবশালী স্থানীয় দৈনিক মাথাভাঙ্গায় এ সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
পত্রিকাটিতে বলা হয়, সরেজমিনে খাদ্য গুদাম এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, সেখানে কৃষকদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অধিকাংশ সময় ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদেরই গুদাম এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, নীতিমালা অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের কথা থাকলেও বাস্তবে দালাল ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই ধান নেওয়া হচ্ছে।
চলতি মৌসুমে সরকারিভাবে যেখানে ৪১ টন ধান কেনার বরাদ্দ রয়েছে, সেখানে গত বছরের ২০ নভেম্বর ২০২৫ থেকে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৬৫১ টন ধান কেনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরে এত বিপুল পরিমাণ ধান কীভাবে কেনা হলো—এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে ধানের বস্তা পরীক্ষা করে দেখা যায়, এক মুঠো ধানের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিটা ধান রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী ধানের আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, এর চেয়ে বেশি আর্দ্রতার ধানও গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি মণ ধানে ১ কেজি করে অতিরিক্ত ঢলন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
নীতিমালায় একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ তিন টন ধান কেনার বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে একাধিক কৃষকের নামে অনেক বেশি ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে প্রকৃত কৃষকরা ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে সদর এলএসডি খাদ্য পরিদর্শক মিরাজ হোসাইনের কার্যালয়ে প্রতিবেদক গেলে তিনি আংশিক তথ্য প্রদান করেন। অনিয়ম সংক্রান্ত প্রশ্নের সরাসরি জবাবে তিনি স্পষ্ট বক্তব্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।
ধান ক্রয়ের রশিদ ও চিটাযুক্ত ধানের নমুনা দেখানোর অনুরোধ জানালে তিনি তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, এসব দেখাতে তিনি বাধ্য নন।
এ সময় তিনি প্রতিবেদককে নগদ অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ‘পজিটিভ নিউজ’ করার অনুরোধ করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি দাবি করেন, সরকারিভাবে বরাদ্দ ৪১ টন হলেও উন্মুক্ত ঘোষণার পর প্রতি কেজি ৩৪ টাকা দরে মোট ৬৫১ টন ধান কেনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক ও ব্যবসায়ী জানান, খাদ্য গুদামে ধান দিতে গেলে প্রতি মণে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন দিতে হয়েছে। ধান মানসম্মত হলেও নানা অজুহাতে তা রিজেক্ট দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাসান মিয়া পত্রিকাটির প্রতিবেদনকে বলেন, চলতি মৌসুমে সারা দেশের জন্য ধান ক্রয় উন্মুক্ত করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার অন্যান্য উপজেলার তুলনায় সদর উপজেলায় তুলনামূলকভাবে কম ধান কেনা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ধান ক্রয় হয়েছে নিয়মের মধ্যেই এবং কোনো অনিয়মের তথ্য তার জানা নেই।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান পত্রিকাটির প্রতিবেদককে জানান, তিনি বর্তমানে জেলার বাইরে অবস্থান করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অনিয়ম হওয়ার কথা নয় এবং তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই। কৃষকদের ধান বিক্রির রশিদ ও অনিয়ম সংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে, সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ক্রয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কৃষক ও সচেতন মহল। তাদের মতে, তদন্ত না হলে প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও ক্ষুণ্ন হবে।
সুত্র : দৈনিক মাথাভাঙ্গা
এএইচ
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 























