০৫:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গার কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসায় ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে ২৮ পরীক্ষার্থী, পাস করল না একজনও!

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসায় এ বছর দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পারেনি একজনও। ফলে মাদ্রাসাটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে। অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২১ জন। এমন ফলাফলে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসাটি ২০০১ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। চলতি বছর মাদ্রাসা থেকে ২৮ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মো. রাফিজুল ইসলাম।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ২১ জন হলেও ২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজনও উত্তীর্ণ না হওয়ায় স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, এতসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়গুলোতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না কেন? শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা পরিচর্যা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসায় কয়েক বছর ধরেই ফলাফলে ধারাবাহিক অবনতি দেখা যাচ্ছে। শিক্ষকদের একটি অংশ নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলাফলেও।

কয়েকজন অভিভানক অভিযোগ করে বলেন, মাদ্রাসার সুপার ও শিক্ষকেরা ঠিকমতো পাঠদান করান না এবং নিয়মিত মাদ্রাসায় আসেন না, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাঁদের অনেকেই শুধু বেতন তোলার জন্য প্রতিষ্ঠানে আসেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সচেতন অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের এই মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীরই বাংলা কবিতা আবৃত্তি বা পাঠ করার মতো মৌলিক দক্ষতা দুর্বল। এতে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষাগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ফল বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসার সুপার আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, কী কারণে শিক্ষার্থীরা সবাই অকৃতকার্য হয়েছে, সেটি তাঁরা বুঝতে পারছেন না। ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়া চলছে।

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মো. রাফিজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে। কেন সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। মাদ্রাসার সুপার খাতা পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করবেন বলেও তাঁকে জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, একটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকার পরও ২৮ জন দাখিল পরীক্ষার্থীর একজনও পাস না করার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি প্রশাসনিক ও একাডেমিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়মিত উপস্থিতি কিংবা পাঠদানে কোনো ধরনের গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় রোগীবাহী ইজিবাইক থামিয়ে মা র ধ রে র প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ : শরীফুজ্জামান শরীফের হস্তক্ষেপে প্রত্যাহার

চুয়াডাঙ্গার কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসায় ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে ২৮ পরীক্ষার্থী, পাস করল না একজনও!

প্রকাশের সময় : ০২:৫৯:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসায় এ বছর দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পারেনি একজনও। ফলে মাদ্রাসাটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে। অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২১ জন। এমন ফলাফলে প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসাটি ২০০১ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। চলতি বছর মাদ্রাসা থেকে ২৮ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মো. রাফিজুল ইসলাম।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ২১ জন হলেও ২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজনও উত্তীর্ণ না হওয়ায় স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, এতসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়গুলোতে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না কেন? শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা পরিচর্যা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসায় কয়েক বছর ধরেই ফলাফলে ধারাবাহিক অবনতি দেখা যাচ্ছে। শিক্ষকদের একটি অংশ নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরীক্ষার ফলাফলেও।

কয়েকজন অভিভানক অভিযোগ করে বলেন, মাদ্রাসার সুপার ও শিক্ষকেরা ঠিকমতো পাঠদান করান না এবং নিয়মিত মাদ্রাসায় আসেন না, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাঁদের অনেকেই শুধু বেতন তোলার জন্য প্রতিষ্ঠানে আসেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সচেতন অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের এই মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীরই বাংলা কবিতা আবৃত্তি বা পাঠ করার মতো মৌলিক দক্ষতা দুর্বল। এতে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষাগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ফল বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কুড়ুলগাছি দাখিল মাদ্রাসার সুপার আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, কী কারণে শিক্ষার্থীরা সবাই অকৃতকার্য হয়েছে, সেটি তাঁরা বুঝতে পারছেন না। ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়া চলছে।

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মো. রাফিজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে। কেন সব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। মাদ্রাসার সুপার খাতা পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করবেন বলেও তাঁকে জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, একটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকার পরও ২৮ জন দাখিল পরীক্ষার্থীর একজনও পাস না করার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি প্রশাসনিক ও একাডেমিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়মিত উপস্থিতি কিংবা পাঠদানে কোনো ধরনের গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।