০৩:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় স্থানীয়দের বাধা-বিতর্কের পর নৃত্যশিল্পী সুবর্ণার মরদেহ দাফন সম্পন্ন

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দৌলতদিয়ার দক্ষিণপাড়ায় নৃত্যশিল্পী সুবর্ণা আক্তারের মরদেহ দাফনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ ছিল, তার চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল। মূলত এসব কারণ দেখিয়েই জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফনে আপত্তি তোলা হয়। কয়েক ঘণ্টা দাফন কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর গোরস্থান কমিটি, স্থানীয়দের প্রতিনিধি, প্রশাসন ও মৃতের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা শেষে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করা হয়।

মৃত সুবর্ণা আক্তারের (২৯) পরিবার গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হলেও দীর্ঘদিন যাবত স্থায়ীভাবে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দৌলতদিয়ার দক্ষিণপাড়ার বসবাস করে আসছেন। তিনি মো. ওহিদ মোল্লা ও মোছা. পারভীন বেগমের মেয়ে এবং ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার ভাটই বাজার এলাকার মো. পাভেল হোসেনের স্ত্রী।

সুবর্ণা আক্তার পেশায় নৃত্যশিল্পী ছিলেন। তিনি ঝিনাইদহের আরাপপুর এলাকার কোর্টপাড়ায় স্বামীর সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন এবং নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। তার বেশ কয়েকটি গানের ভিডিও প্রকাশ হয়েছিল।

স্থানীয়দের দাবি, তার নাচের অঙ্গভঙ্গি ছিল অশ্লীল এবং চলাফেরা ছিল বেপরোয়া। এ কারণেই মূলত চুয়াডাঙ্গার শহরতলী দৌলতদিয়াড় গ্রামের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দাদের একটি অংশ তার দাফনে বাধা দেয়। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় রাতে দাফন সম্পন্ন হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ মে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঝিনাইদহের শৈলকূপায় স্বামীর বাড়িতে পারিবারিক কলহের জেরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন সুবর্ণা। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছে।

পরিবার সূত্রে আরও জানা যায়, সুবর্ণার আগে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার কুলচারা এলাকায় বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসারে তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। প্রায় ছয় বছর আগে দাম্পত্য কলহের জেরে তিনি প্রথম স্বামী ও সন্তানদের রেখে ঝিনাইদহের শৈলকূপার এক ব্যক্তির সঙ্গে নতুন করে সংসার শুরু করেন। পরিবারের দাবি, সাম্প্রতিক পারিবারিক অশান্তির কারণেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে সুবর্ণার মরদেহ চুয়াডাঙ্গার দৌলতদিয়া দক্ষিণপাড়ার নিজ বাড়িতে আনা হলে দাফনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফনের অনুমতি চাইলে গোরস্থান কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মৃতের পরিবার কমিটির সদস্য নয়। সদস্যপদ গ্রহণের জন্য নির্ধারিত কয়েক ধাপে মোট ২২ হাজার টাকা পরিশোধের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।

এ সময় স্থানীয়দের একটি অংশ আপত্তি জানিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুবর্ণার চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল। কেউ কেউ পরিবারের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ তোলেন।

এলাকার বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বলেন, তার চলাফেরা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাদের আপত্তি ছিল। তাই এলাকাবাসী এখানে দাফন দিতে রাজি হয়নি।

আরেক বাসিন্দা মিনারুল ইসলাম বলেন, এটি আমাদের নিজস্ব কবরস্থান। তিনি বা তার পরিবার এখানে সদস্য না। আগে সদস্য হওয়ার কথা বলা হলেও তারা তা মানেননি।

অন্যদিকে, মৃতের পরিবারের সদস্যরা এসব আপত্তির প্রতিবাদ জানান। সুবর্ণার সৎবাবা বলেন, এর আগে আমাদের পরিবারের আরেক সদস্যকে এখানেই দাফন করা হয়েছে। এখন কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কবর খুঁড়তেও দেওয়া হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে অন্য কোথাও দাফনের কথা ভাবছিলাম।

পরে গোরস্থান কমিটি ও মৃতের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। একপর্যায়ে পরিবারটি কবরস্থান কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়ে সম্মত হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে দৌলতদিয়ার দক্ষিণপাড়া জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী সুবর্ণা আক্তারের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। রাতেই দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

ব্যাগ ধরে টান ছিনতাইকারীর, রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকার মৃ ত্যু

চুয়াডাঙ্গায় স্থানীয়দের বাধা-বিতর্কের পর নৃত্যশিল্পী সুবর্ণার মরদেহ দাফন সম্পন্ন

প্রকাশের সময় : ১১:১৪:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দৌলতদিয়ার দক্ষিণপাড়ায় নৃত্যশিল্পী সুবর্ণা আক্তারের মরদেহ দাফনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ ছিল, তার চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল। মূলত এসব কারণ দেখিয়েই জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফনে আপত্তি তোলা হয়। কয়েক ঘণ্টা দাফন কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর গোরস্থান কমিটি, স্থানীয়দের প্রতিনিধি, প্রশাসন ও মৃতের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা শেষে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করা হয়।

মৃত সুবর্ণা আক্তারের (২৯) পরিবার গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হলেও দীর্ঘদিন যাবত স্থায়ীভাবে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দৌলতদিয়ার দক্ষিণপাড়ার বসবাস করে আসছেন। তিনি মো. ওহিদ মোল্লা ও মোছা. পারভীন বেগমের মেয়ে এবং ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার ভাটই বাজার এলাকার মো. পাভেল হোসেনের স্ত্রী।

সুবর্ণা আক্তার পেশায় নৃত্যশিল্পী ছিলেন। তিনি ঝিনাইদহের আরাপপুর এলাকার কোর্টপাড়ায় স্বামীর সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন এবং নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। তার বেশ কয়েকটি গানের ভিডিও প্রকাশ হয়েছিল।

স্থানীয়দের দাবি, তার নাচের অঙ্গভঙ্গি ছিল অশ্লীল এবং চলাফেরা ছিল বেপরোয়া। এ কারণেই মূলত চুয়াডাঙ্গার শহরতলী দৌলতদিয়াড় গ্রামের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দাদের একটি অংশ তার দাফনে বাধা দেয়। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় রাতে দাফন সম্পন্ন হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ মে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঝিনাইদহের শৈলকূপায় স্বামীর বাড়িতে পারিবারিক কলহের জেরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন সুবর্ণা। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছে।

পরিবার সূত্রে আরও জানা যায়, সুবর্ণার আগে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার কুলচারা এলাকায় বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসারে তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান রয়েছে। প্রায় ছয় বছর আগে দাম্পত্য কলহের জেরে তিনি প্রথম স্বামী ও সন্তানদের রেখে ঝিনাইদহের শৈলকূপার এক ব্যক্তির সঙ্গে নতুন করে সংসার শুরু করেন। পরিবারের দাবি, সাম্প্রতিক পারিবারিক অশান্তির কারণেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে সুবর্ণার মরদেহ চুয়াডাঙ্গার দৌলতদিয়া দক্ষিণপাড়ার নিজ বাড়িতে আনা হলে দাফনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফনের অনুমতি চাইলে গোরস্থান কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মৃতের পরিবার কমিটির সদস্য নয়। সদস্যপদ গ্রহণের জন্য নির্ধারিত কয়েক ধাপে মোট ২২ হাজার টাকা পরিশোধের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।

এ সময় স্থানীয়দের একটি অংশ আপত্তি জানিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুবর্ণার চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল। কেউ কেউ পরিবারের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ তোলেন।

এলাকার বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বলেন, তার চলাফেরা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাদের আপত্তি ছিল। তাই এলাকাবাসী এখানে দাফন দিতে রাজি হয়নি।

আরেক বাসিন্দা মিনারুল ইসলাম বলেন, এটি আমাদের নিজস্ব কবরস্থান। তিনি বা তার পরিবার এখানে সদস্য না। আগে সদস্য হওয়ার কথা বলা হলেও তারা তা মানেননি।

অন্যদিকে, মৃতের পরিবারের সদস্যরা এসব আপত্তির প্রতিবাদ জানান। সুবর্ণার সৎবাবা বলেন, এর আগে আমাদের পরিবারের আরেক সদস্যকে এখানেই দাফন করা হয়েছে। এখন কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কবর খুঁড়তেও দেওয়া হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে অন্য কোথাও দাফনের কথা ভাবছিলাম।

পরে গোরস্থান কমিটি ও মৃতের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। একপর্যায়ে পরিবারটি কবরস্থান কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়ে সম্মত হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে দৌলতদিয়ার দক্ষিণপাড়া জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী সুবর্ণা আক্তারের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। রাতেই দাফন সম্পন্ন হয়েছে।