চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি ভুয়া জন্মনিবন্ধন চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রায়হান মাহমুদ (৩৫) এবং উদ্যোক্তা মো. আরিফুল ইসলাম (৩০) দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও প্রতারণার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলার নাগরিকদের নামে ভুয়া ঠিকানায় জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করে আসছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার লোকজনকে বেগমপুর ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা দেখিয়ে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদান করা হতো।
আরও পড়ুন
চুয়াডাঙ্গা শহরে প্রকাশ্যে জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে মারধর করে তুলে নিল দুর্বৃত্তরা
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ৭ মে। ওইদিন এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সরকারি মোবাইল নম্বরে এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
সরেজমিন অনুসন্ধানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিশ্চিত হন যে, যেসব ব্যক্তির নামে জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করা হয়েছে, তারা কেউই বেগমপুর ইউনিয়নের প্রকৃত বাসিন্দা নন। এমনকি স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের কাউকে চিনতে পারেননি। তদন্তে আরও জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের নির্ধারিত নিবন্ধন আইডি ও ডিজিটাল সিস্টেম অপব্যবহার করে উদ্যোক্তা আরিফুল ইসলাম নিজেই জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং প্রশাসনিক নীতিমালার পরিপন্থি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে অসদুপায়ে জন্মনিবন্ধন তৈরির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, এই চক্রের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করা হয়েছে, যা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম বাদী হয়ে দর্শনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে দর্শনা থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) হিমেল রানা বলেন, ইউএনও মহোদয়ের তদন্ত শেষে মামলা হয়েছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
চুয়াডাঙ্গায় মৃত্যুর আগে চিরকুটে যা লিখেছিলেন তরুণী অহনা
এদিকে জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবায় এমন ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, একটি ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি হওয়া প্রশাসনিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। একইসঙ্গে এটি জাতীয় পরিচয় ও নাগরিক তথ্যব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, ইতোমধ্যে এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। খুব দ্রুত পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনা হবে।
এএইচ
দামুড়হুদা অফিস 

























