জ্বালানি তেল সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলায়। জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না সাধারণ চালকরা। এতে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অনেকের পেশাগত ও দৈনন্দিন কার্যক্রম।
চুয়াডাঙ্গা শহরের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগের কর্মী আসলাম উদ্দিন সেই ভোগান্তিরই এক বাস্তব উদাহরণ। ভোর থেকে শহরের তিনটি ফিলিং স্টেশনে ঘুরেও তেল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সকাল ৯টার দিকে একটি প্রধান পাম্পে লাইনে দাঁড়ান তিনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বেলা দুইটার দিকে মাত্র ৩০০ টাকার পেট্রোল পান।
ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে ব্যবসায়ী সাইফুল বলেন, “হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে অবশেষে তেল পেলাম। সকাল ৯টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে এক বেলা শেষ হয়ে গেল। অন্য বেলায় কাজ করবো কখন? ৩০০ টাকার তেলে তো দুদিনও চলবে না। এভাবে চলতে থাকলে আমার চাকরিটাই ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে শত শত মোটরসাইকেল চালক পেট্রোল ও অকটেনের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে। পাম্প কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে ভিড় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সাইফুলের মতো অন্তত ২ হাজার ৫০০ চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারির কারণে অন্যান্য যানবাহনের প্রবেশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি দুপুর ১টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাম্পে প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়—যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে।
ভুক্তভোগী চালকদের অভিযোগ, অনেক পাম্পে জ্বালানি তেলের জোগান থাকলেও তা সার্বক্ষণিক সরবরাহ করা হচ্ছে না। নির্দিষ্ট কিছু সময় তেল দিয়ে পাম্প বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, ফলে সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
তবে ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করছে না। ফলে ২৪ ঘণ্টা তেল সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। একটি পাম্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চে তেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ সে অনুযায়ী বাড়েনি।
সদরের দীননাথপুর থেকে আসা সজিব উদ্দিন বলেন, “জরুরি প্রয়োজনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করি। কিন্তু এখন সেটি চালানোই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রায় ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করে মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছি। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি চাই।”
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, জেলার কিছু ফিলিং স্টেশনে তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও তা বিক্রি না করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন কিছু পাম্পে নিজস্ব যানবাহনের জন্য তেল সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
জেলার সদর, আলমডাঙ্গা ও জীবননগর উপজেলার অধিকাংশ পাম্প দিনের বড় একটি সময় বন্ধ থাকছে। দু-একদিন পরপর তেল এলেও তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক চালক খালি হাতে ফিরছেন।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক বলেন, “সারাদেশেই তেলের কিছুটা সংকট রয়েছে, যার প্রভাব স্থানীয় পাম্পগুলোতেও পড়েছে। তবে কোনো ফিলিং স্টেশন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেল মজুত রাখলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
এএইচ
রেডিও চুয়াডাঙ্গা ডেস্ক 























