০২:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমীর আল্লামা শফীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আল্লামা আহমদ শফী : যার তর্জনীর গর্জনে প্রথম কেঁপেছিল হাসিনার মসনদ!

Ada. Munna Telecom1

২০১৩ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগে গড়ে ওঠে “গণজাগরণ মঞ্চ”। শুরুতে এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলন। তবে ক্রমেই এর মধ্য থেকে ভেসে আসে ইসলামবিদ্বেষী নানা স্লোগান ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি।

এই প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করে “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ”। মুহূর্তেই বাংলার মাটি কাঁপিয়ে ওঠে স্লোগান— “বিশ্বনবীর অপমান, সইবে না আর মুসলমান”। আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে সামনে আসেন দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিস আল্লামা আহমদ শফী।

তার নেতৃত্বেই ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় হেফাজতের “লং মার্চ” কর্মসূচি। সেদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত লাখো মানুষের পদচারণায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানী। সেই মহাসমাবেশ থেকে উত্থাপিত হয় আলোচিত ১৩ দফা দাবি। অনেকের মতে, শাপলার মঞ্চে আল্লামা শফীর তর্জনীর গর্জনেই প্রথমবার কেঁপে ওঠে শাহবাগ আন্দোলনের কেন্দ্র এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার আসন।

লং মার্চের দুই দিন পর ৮ এপ্রিল ডাকা হয় হরতাল। এদিন দেশব্যাপী জনসমর্থন পায় হেফাজত। দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, থেমে যায় বাসসহ অন্যান্য যানবাহন। রাজধানী ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মিছিল, অবরোধ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং পুলিশের গুলিবর্ষণে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ।

এরপর ৫ মে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ঢাকা অবরোধ। ফজরের নামাজ শেষে প্রশাসনের কঠোর বাধা উপেক্ষা করে হেফাজতের নেতাকর্মীরা ঢাকার ছয়টি প্রবেশপথ দখলে নেন। গাবতলী, টঙ্গী, কাঁচপুর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, টিকাটুলি ও পল্টনসহ রাজধানীর নানা জায়গায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা শহর কার্যত হেফাজতের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

কিন্তু রাত নামতেই নেমে আসে ভয়াবহতা। “অপারেশন শাপলা” বা “ফ্ল্যাশ আউট” নামে পরিচালিত অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেয় বলে অভিযোগ ওঠে। গুলি, টিআরশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডে কেঁপে ওঠে শাপলা চত্বর। পালানোর পথে ও আশপাশের ভবনে আশ্রয় নেওয়া অনেককেই গুলি করে হত্যা করা হয়। শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে বলে দাবি করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। রক্তে রঞ্জিত শাপলা চত্বরের সেই দৃশ্য ইতিহাসে চিহ্নিত হয় “রক্তাক্ত শাপলা” হিসেবে।

এরপরও আল্লামা শফীর প্রভাব ম্লান হয়নি। তিনি হয়ে ওঠেন দেশের আলেমসমাজ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আস্থার প্রতীক। ইসলামী শিক্ষা, সামাজিক শুদ্ধতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার লড়াইয়ে তার নাম উচ্চারিত হতে থাকে সর্বত্র।

২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এই মহাপুরুষ ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে নেমে আসে গভীর শোক। লাখো ছাত্র, শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ মানুষ কাঁদে তার বিদায়ে।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জন্ম নেওয়া আহমদ শফী শৈশব থেকেই ধর্মীয় অনুরাগে বেড়ে ওঠেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন হাটহাজারী মাদরাসায়। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য যান ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দে, সেখান থেকে কুরআন-হাদিস ও ইসলামি ফিকহে উচ্চ জ্ঞান অর্জন করে ফিরে আসেন দেশে। কয়েক দশক শিক্ষকতার পর তিনি হন হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিস। সহজবোধ্য পাঠদান, হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য ও দৃঢ় নেতৃত্বে তিনি সমাদৃত হন সর্বত্র।

ব্যক্তিজীবনে আল্লামা শফী ছিলেন বিনয়ী, আধ্যাত্মিক ও দৃঢ়চেতা। তিনি সর্বদা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনায় গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যে সাধারণ মানুষ যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছে, তেমনি আলেম সমাজও পেয়েছে প্রেরণা।

বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে তাই তিনি হয়ে আছেন এক অবিস্মরণীয় নাম—যার তর্জনীর গর্জনে একদিন কেঁপে উঠেছিল ক্ষমতার মসনদ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় ইউপি সদস্যের বাড়িতে লুকানো ছিল ১০০০ লিটার ডিজেল: ১৫ দিনের কারাদণ্ড

হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমীর আল্লামা শফীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আল্লামা আহমদ শফী : যার তর্জনীর গর্জনে প্রথম কেঁপেছিল হাসিনার মসনদ!

প্রকাশের সময় : ১০:৪৫:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

২০১৩ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগে গড়ে ওঠে “গণজাগরণ মঞ্চ”। শুরুতে এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলন। তবে ক্রমেই এর মধ্য থেকে ভেসে আসে ইসলামবিদ্বেষী নানা স্লোগান ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে কটূক্তি।

এই প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করে “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ”। মুহূর্তেই বাংলার মাটি কাঁপিয়ে ওঠে স্লোগান— “বিশ্বনবীর অপমান, সইবে না আর মুসলমান”। আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে সামনে আসেন দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিস আল্লামা আহমদ শফী।

তার নেতৃত্বেই ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় হেফাজতের “লং মার্চ” কর্মসূচি। সেদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত লাখো মানুষের পদচারণায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানী। সেই মহাসমাবেশ থেকে উত্থাপিত হয় আলোচিত ১৩ দফা দাবি। অনেকের মতে, শাপলার মঞ্চে আল্লামা শফীর তর্জনীর গর্জনেই প্রথমবার কেঁপে ওঠে শাহবাগ আন্দোলনের কেন্দ্র এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতার আসন।

লং মার্চের দুই দিন পর ৮ এপ্রিল ডাকা হয় হরতাল। এদিন দেশব্যাপী জনসমর্থন পায় হেফাজত। দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, থেমে যায় বাসসহ অন্যান্য যানবাহন। রাজধানী ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মিছিল, অবরোধ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং পুলিশের গুলিবর্ষণে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ।

এরপর ৫ মে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ঢাকা অবরোধ। ফজরের নামাজ শেষে প্রশাসনের কঠোর বাধা উপেক্ষা করে হেফাজতের নেতাকর্মীরা ঢাকার ছয়টি প্রবেশপথ দখলে নেন। গাবতলী, টঙ্গী, কাঁচপুর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, টিকাটুলি ও পল্টনসহ রাজধানীর নানা জায়গায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা শহর কার্যত হেফাজতের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

কিন্তু রাত নামতেই নেমে আসে ভয়াবহতা। “অপারেশন শাপলা” বা “ফ্ল্যাশ আউট” নামে পরিচালিত অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেয় বলে অভিযোগ ওঠে। গুলি, টিআরশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডে কেঁপে ওঠে শাপলা চত্বর। পালানোর পথে ও আশপাশের ভবনে আশ্রয় নেওয়া অনেককেই গুলি করে হত্যা করা হয়। শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে বলে দাবি করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। রক্তে রঞ্জিত শাপলা চত্বরের সেই দৃশ্য ইতিহাসে চিহ্নিত হয় “রক্তাক্ত শাপলা” হিসেবে।

এরপরও আল্লামা শফীর প্রভাব ম্লান হয়নি। তিনি হয়ে ওঠেন দেশের আলেমসমাজ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আস্থার প্রতীক। ইসলামী শিক্ষা, সামাজিক শুদ্ধতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার লড়াইয়ে তার নাম উচ্চারিত হতে থাকে সর্বত্র।

২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এই মহাপুরুষ ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে নেমে আসে গভীর শোক। লাখো ছাত্র, শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ মানুষ কাঁদে তার বিদায়ে।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জন্ম নেওয়া আহমদ শফী শৈশব থেকেই ধর্মীয় অনুরাগে বেড়ে ওঠেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন হাটহাজারী মাদরাসায়। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য যান ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দে, সেখান থেকে কুরআন-হাদিস ও ইসলামি ফিকহে উচ্চ জ্ঞান অর্জন করে ফিরে আসেন দেশে। কয়েক দশক শিক্ষকতার পর তিনি হন হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিস। সহজবোধ্য পাঠদান, হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য ও দৃঢ় নেতৃত্বে তিনি সমাদৃত হন সর্বত্র।

ব্যক্তিজীবনে আল্লামা শফী ছিলেন বিনয়ী, আধ্যাত্মিক ও দৃঢ়চেতা। তিনি সর্বদা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনায় গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যে সাধারণ মানুষ যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছে, তেমনি আলেম সমাজও পেয়েছে প্রেরণা।

বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে তাই তিনি হয়ে আছেন এক অবিস্মরণীয় নাম—যার তর্জনীর গর্জনে একদিন কেঁপে উঠেছিল ক্ষমতার মসনদ।