০৮:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার দায়ে স্বামীর আমৃত্যু কারাদণ্ড

চুয়াডাঙ্গায় স্ত্রী আলেয়া বেগমকে ধারালো দা দিয়ে গলা কেটে হত্যার দায়ে রহম আলী (৬০) নামের এক ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে চুয়াডাঙ্গার বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক শিমুল কুমার বিশ্বাস এ রায় ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাঈদ মাহমুদ ডালিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত রহম আলী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের মৃত আবু তালেবের ছেলে।

আদালতের নথি ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে রহম আলীর সঙ্গে আলেয়া বেগমের (৪০) বিয়ে হয়। তাঁদের চার সন্তান রয়েছে। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, আলেয়াকে বিয়ের আগে রহম আলীর আরও দুটি বিয়ে হয়েছিল। তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে মারধর করতেন।

২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর রাতে খাবার খেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। রহম আলী ও আলেয়া একই ঘরের মেঝেতে ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁদের দুই মেয়ে লিপছিয়া ও হালিমা ওই ঘরের একটি কাঠের চৌকিতে ঘুমিয়ে ছিল।

পরদিন ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দরজা খোলার শব্দে লিপছিয়ার ঘুম ভাঙে। সে দেখতে পায়, তার বাবা রহম আলীর হাতে রক্তমাখা একটি গাছি দা। রহম আলী দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যান। পরে চৌকির নিচে তাকিয়ে লিপছিয়া তার মায়ের গলাকাটা রক্তাক্ত দেহ দেখতে পায়। তার চিৎকারে পরিবারের অন্য সদস্যরা ছুটে এসে আলেয়ার লাশ দেখতে পান। পরে প্রতিবেশীরাও ঘটনাস্থলে জড়ো হন।

এ ঘটনায় আলেয়ার ছেলে চাঁন মিয়া বাদী হয়ে তাঁর বাবা রহম আলীর বিরুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পারিবারিক কলহের জেরে রহম আলী পরিকল্পিতভাবে ধারালো গাছি দা দিয়ে তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মহসিন আলী। তদন্তকালে ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা পাটি, বালিশ, মশারি ও কাপড়সহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়। পরে আলেয়ার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, রহম আলীকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্যপ্রমাণ, ঘটনাপরিস্থিতি ও আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের ৪ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলায় ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে রহম আলীকে তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া মামলায় জব্দ করা আলামত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাঈদ মাহমুদ ডালিম বলেন, “মামলায় উপস্থাপিত ১৩ জনের সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের এ রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মিল্টন গ্রেপ্তার

চুয়াডাঙ্গায় স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার দায়ে স্বামীর আমৃত্যু কারাদণ্ড

প্রকাশের সময় : ১০:২৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

চুয়াডাঙ্গায় স্ত্রী আলেয়া বেগমকে ধারালো দা দিয়ে গলা কেটে হত্যার দায়ে রহম আলী (৬০) নামের এক ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে চুয়াডাঙ্গার বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক শিমুল কুমার বিশ্বাস এ রায় ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাঈদ মাহমুদ ডালিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত রহম আলী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের মৃত আবু তালেবের ছেলে।

আদালতের নথি ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে রহম আলীর সঙ্গে আলেয়া বেগমের (৪০) বিয়ে হয়। তাঁদের চার সন্তান রয়েছে। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, আলেয়াকে বিয়ের আগে রহম আলীর আরও দুটি বিয়ে হয়েছিল। তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে মারধর করতেন।

২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর রাতে খাবার খেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। রহম আলী ও আলেয়া একই ঘরের মেঝেতে ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁদের দুই মেয়ে লিপছিয়া ও হালিমা ওই ঘরের একটি কাঠের চৌকিতে ঘুমিয়ে ছিল।

পরদিন ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দরজা খোলার শব্দে লিপছিয়ার ঘুম ভাঙে। সে দেখতে পায়, তার বাবা রহম আলীর হাতে রক্তমাখা একটি গাছি দা। রহম আলী দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যান। পরে চৌকির নিচে তাকিয়ে লিপছিয়া তার মায়ের গলাকাটা রক্তাক্ত দেহ দেখতে পায়। তার চিৎকারে পরিবারের অন্য সদস্যরা ছুটে এসে আলেয়ার লাশ দেখতে পান। পরে প্রতিবেশীরাও ঘটনাস্থলে জড়ো হন।

এ ঘটনায় আলেয়ার ছেলে চাঁন মিয়া বাদী হয়ে তাঁর বাবা রহম আলীর বিরুদ্ধে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পারিবারিক কলহের জেরে রহম আলী পরিকল্পিতভাবে ধারালো গাছি দা দিয়ে তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মহসিন আলী। তদন্তকালে ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা পাটি, বালিশ, মশারি ও কাপড়সহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়। পরে আলেয়ার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, রহম আলীকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্যপ্রমাণ, ঘটনাপরিস্থিতি ও আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের ৪ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলায় ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে রহম আলীকে তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া মামলায় জব্দ করা আলামত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাঈদ মাহমুদ ডালিম বলেন, “মামলায় উপস্থাপিত ১৩ জনের সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের এ রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।