০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়াডাঙ্গায় ট্রেনে কা টা পড়ে বিধবা সামিরণের ৮ ছাগলের মৃ ত্যু, হারালেন বেঁ চে থাকার শেষ অবলম্বন

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের আমিরপুর রেলগেটের অদূরে ট্রেনে কাটা পড়ে হতদরিদ্র বিধবা সামিরণ বেগমের আটটি ছাগল মারা গেছে। দীর্ঘদিনের কষ্ট, পরিশ্রম ও সঞ্চয়ে গড়ে তোলা ছাগলগুলো হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন ৬০ বছর বয়সী এই নারী। সংসার চালানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের আশায় লালন করা ছাগলগুলোই এক মুহূর্তে কেড়ে নিয়েছে তাঁর শেষ সম্বল।

রোববার (৪ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনা থেকে ছেড়ে আসা পার্বতীপুরগামী রকেট মেইল (লোকাল) ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ছাগলগুলোর মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামিরণ বেগম চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা। তিনি মৃত সাত্তার আলীর স্ত্রী। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে একাই জীবন চালিয়ে আসছেন তিনি। মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনোভাবে সংসার চলে। সেই আয়ের পাশাপাশি কয়েকটি ছাগল পালন করতেন সামিরণ। মানুষের বাড়িতে কাজ করা আর অবসর সময়ে ছাগল চরানো—এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তাঁর দিন।

রোববার দুপুরে ১০টি ছাগল নিয়ে আমিরপুর রেলগেটের অদূরের মাঠে চরাতে যান সামিরণ। একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত কয়েকটি ছাগল রেললাইনের ওপর উঠে যায়। ঠিক তখনই খুলনা থেকে ছেড়ে আসা রকেট এক্সপ্রেস ট্রেনটি সেখানে পৌঁছালে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে আটটি ছাগল মারা যায়।

চোখের সামনে একে একে নিজের ছাগলগুলোর প্রাণহীন হয়ে পড়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সামিরণ। যে ছাগলগুলোকে তিনি দিনের পর দিন কষ্ট করে লালন-পালন করেছিলেন, সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও খাবার জুগিয়েছিলেন, সেই ছাগলগুলোই ছিল তাঁর ভবিষ্যতের শেষ ভরসা। মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনায় সেই অবলম্বনটুকুও হারিয়ে এখন দিশেহারা তিনি।

স্বামীকে হারানোর পর একদিকে অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই, অন্যদিকে জীবনের শেষ বয়সে এসে উপার্জনের সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে সামিরণের সামনে এখন আরও কঠিন অনিশ্চয়তা। ছাগলগুলো শুধু তাঁর পালন করা গৃহপালিত প্রাণী ছিল না; এগুলো ছিল তাঁর কষ্টার্জিত সঞ্চয়, সংসারের সহায় এবং বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সামিরণ বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে বেঁচে আছি। অনেক কষ্ট করে, না খেয়ে-না পরে ছাগলগুলো পালন করেছি। সকালে মানুষের বাড়িতে কাজ করি, বিকেলে ছাগল চরাই। এই ছাগলগুলোই ছিল আমার বেঁচে থাকার ভরসা। আজ সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব? আমার আর কিছুই রইল না।

সামিরণের এই কান্না কেবল আটটি ছাগল হারানোর শোক নয়; এর আড়ালে রয়েছে স্বামীহারা এক নারীর দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, অল্প অল্প করে গড়ে তোলা একটি শেষ আশ্রয় এবং জীবনের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা।

এই কঠিন সময়ে সামিরণের পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সামান্য সহায়তাও হয়তো স্বামীহারা এই নারীর জীবনে আবারও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতে পারে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয়

চুয়াডাঙ্গায় ট্রেনে কা টা পড়ে বিধবা সামিরণের ৮ ছাগলের মৃ ত্যু, হারালেন বেঁ চে থাকার শেষ অবলম্বন

চুয়াডাঙ্গায় ট্রেনে কা টা পড়ে বিধবা সামিরণের ৮ ছাগলের মৃ ত্যু, হারালেন বেঁ চে থাকার শেষ অবলম্বন

প্রকাশের সময় : ০৭:৫৬:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের আমিরপুর রেলগেটের অদূরে ট্রেনে কাটা পড়ে হতদরিদ্র বিধবা সামিরণ বেগমের আটটি ছাগল মারা গেছে। দীর্ঘদিনের কষ্ট, পরিশ্রম ও সঞ্চয়ে গড়ে তোলা ছাগলগুলো হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন ৬০ বছর বয়সী এই নারী। সংসার চালানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের আশায় লালন করা ছাগলগুলোই এক মুহূর্তে কেড়ে নিয়েছে তাঁর শেষ সম্বল।

রোববার (৪ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনা থেকে ছেড়ে আসা পার্বতীপুরগামী রকেট মেইল (লোকাল) ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ছাগলগুলোর মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামিরণ বেগম চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা। তিনি মৃত সাত্তার আলীর স্ত্রী। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে একাই জীবন চালিয়ে আসছেন তিনি। মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনোভাবে সংসার চলে। সেই আয়ের পাশাপাশি কয়েকটি ছাগল পালন করতেন সামিরণ। মানুষের বাড়িতে কাজ করা আর অবসর সময়ে ছাগল চরানো—এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তাঁর দিন।

রোববার দুপুরে ১০টি ছাগল নিয়ে আমিরপুর রেলগেটের অদূরের মাঠে চরাতে যান সামিরণ। একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত কয়েকটি ছাগল রেললাইনের ওপর উঠে যায়। ঠিক তখনই খুলনা থেকে ছেড়ে আসা রকেট এক্সপ্রেস ট্রেনটি সেখানে পৌঁছালে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে আটটি ছাগল মারা যায়।

চোখের সামনে একে একে নিজের ছাগলগুলোর প্রাণহীন হয়ে পড়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সামিরণ। যে ছাগলগুলোকে তিনি দিনের পর দিন কষ্ট করে লালন-পালন করেছিলেন, সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও খাবার জুগিয়েছিলেন, সেই ছাগলগুলোই ছিল তাঁর ভবিষ্যতের শেষ ভরসা। মুহূর্তের একটি দুর্ঘটনায় সেই অবলম্বনটুকুও হারিয়ে এখন দিশেহারা তিনি।

স্বামীকে হারানোর পর একদিকে অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই, অন্যদিকে জীবনের শেষ বয়সে এসে উপার্জনের সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে সামিরণের সামনে এখন আরও কঠিন অনিশ্চয়তা। ছাগলগুলো শুধু তাঁর পালন করা গৃহপালিত প্রাণী ছিল না; এগুলো ছিল তাঁর কষ্টার্জিত সঞ্চয়, সংসারের সহায় এবং বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সামিরণ বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে বেঁচে আছি। অনেক কষ্ট করে, না খেয়ে-না পরে ছাগলগুলো পালন করেছি। সকালে মানুষের বাড়িতে কাজ করি, বিকেলে ছাগল চরাই। এই ছাগলগুলোই ছিল আমার বেঁচে থাকার ভরসা। আজ সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব? আমার আর কিছুই রইল না।

সামিরণের এই কান্না কেবল আটটি ছাগল হারানোর শোক নয়; এর আড়ালে রয়েছে স্বামীহারা এক নারীর দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, অল্প অল্প করে গড়ে তোলা একটি শেষ আশ্রয় এবং জীবনের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা।

এই কঠিন সময়ে সামিরণের পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সামান্য সহায়তাও হয়তো স্বামীহারা এই নারীর জীবনে আবারও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতে পারে।